ওজনঘরে বেড়ে ওঠা শিশুরা

চা-বাগানের ওজনঘরে শিশুরা দোলনায় দোল খাচ্ছে। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার রত্না চা-বাগানের মোকাম সেকশনে। ছবি: প্রথম আলো
চা-বাগানের ওজনঘরে শিশুরা দোলনায় দোল খাচ্ছে। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার রত্না চা-বাগানের মোকাম সেকশনে।  ছবি: প্রথম আলো

ওজনঘরে তো ওজন দেওয়া হবে একটি কুঁড়ি দুটি পাতার। অন্তত সেটাই তো হওয়ার কথা। কিন্তু মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার রত্না চা-বাগানের ওজনঘরে কী দেখা যায়?

হ্যাঁ, ছবিতে যেটা দেখছেন, সেটা ওজনঘরই। আর এই মানুষদের সঙ্গে যে শিশুদের দেখছেন, তারা সারা দিন এই ওজনঘরেই থাকে, খেলে, ঘুমায়।

সাতসকালে ঘর থেকে কাজের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন চা-শ্রমিক নারীরা। শিশুসন্তানদের কর্মস্থলের কাছাকাছি স্থাপিত ওজনঘরেই রেখে যান তাঁরা। কাজ শেষে বিকেলে সন্তানকে নিয়ে আবার বাড়ি ফেরেন। চা-বাগানে এ ঘটনা নতুন নয়।

রত্না চা-বাগানে টিনের ছাউনি দেওয়া চারপাশ খোলা ছোট একটি পাকা ঘর। এটির ভেতরে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১০ থেকে ১২টি শিশু। দেখা গেল, তাদের কেউ কেউ মেঝেতে বসে খেলছে। কাউকে খাওয়ানো হচ্ছে। ঘরের দুই পাশের পাকা খুঁটিতে শাড়ি বেঁধে তৈরি দোলনায় দু-তিনটি শিশুকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। জায়গাটি বাগানের ৪ নম্বর মোকাম সেকশনে পড়েছে।

বয়স্ক তিন নারী শিশুদের দেখভাল করছিলেন। তাঁদের একজন আদরমণি উরাং। ৬০ বছর বয়স তাঁর। তিনি বললেন, ‘বয়স হইছে। এখন আর পাতা তুলতে পারি না। বাচ্চাদের দেখাশোনার কাজ করি। খাওয়াই, ঘুম পাড়াই, গল্প করি। সময় কাইট্যা যায়।’

দেখাশোনাকারী নারীরা বলেন, দুপুরের বিরতিতে মায়েরা এসে সন্তানদের বুকের দুধ খাইয়ে আবার কাজে ফেরেন। অনেকে টিফিন ক্যারিয়ারে করে বাড়ি থেকে সন্তানের জন্য খাবার নিয়ে আসেন।

সাপ্তাহিক ছুটির দিন বাদে বাকি ছয় দিনই দিনের বেলা এই শিশুরা এখানেই থাকে। প্রতিদিন সকাল নয়টার দিকে বাগানে কাজ শুরু হয়। চলে বিকেল চারটা পর্যন্ত। শিশুরা প্রায় আট ঘণ্টা ওজনঘরে থাকে।

বাগানের শ্রমিক পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সুমন ঘোষ বলেন, এখানে চায়ের কুঁড়ি ওজন দেওয়া হয়। তাই এটিকে ওজনঘর বলে। বাগানের বিভিন্ন স্থানে আটটি ওজনঘর রয়েছে। সম্প্রতি পঞ্চায়েত কমিটির পক্ষ থেকে ওজনঘরে থাকা শিশুদের দুপুরের খাবারের জন্য খিচুড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পাশের একটি টিলার ঢালে চায়ের কুঁড়ি সংগ্রহে ব্যস্ত চা-শ্রমিক নিয়তি রায় বলেন, ‘ঘরে বাচ্চা দেখার মতো লোক নাই। তাই প্রতিদিন ওজনঘরেই রেখে কাজে আসি। বাচ্চা ভালোই থাকে।’