
নাটোর জেলা আদালত চত্বরের প্রবেশপথের পাশে বস্তার ওপর ভেষজ গাছগাছড়া নিয়ে বসে আছেন সত্তরোর্ধ্ব আবদুল কাদের। বিক্রির আশায় পথচারীদের দিকে চেয়ে আছেন আনমনে। কিন্তু কেউ কাছে আসছেন না, বিক্রিও আর হচ্ছে না। বেলা বাড়তে থাকে। জোহরের আজান পড়ে যায়। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আসে তাঁর। শেষ পর্যন্ত সব ভেষজ উদ্ভিদ ব্যাগে ঢুকিয়ে শূন্য পকেটে বাড়ির পথে হাঁটতে থাকেন আবদুল কাদের।
এক সপ্তাহ ধরে এমন দৃশ্য দেখার পর বৃহস্পতিবার দুপুরে আবদুল কাদেরের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিনিধির। তাঁর ভাষ্যমতে, তিনি ১৯৬৯ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মোটরগাড়ি চালাতেন। এক দুর্ঘটনার পর তাঁর দৃষ্টিশক্তি কমতে থাকে। ফলে পেশা পরিবর্তন করে ভেষজ গাছগাছড়া বিক্রি করতে শুরু করেন। এতে ভালোই চলছিল সংসার। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বিক্রি হতো। ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লাভ থাকত। তা দিয়ে অসুস্থ স্ত্রী ও কলেজপড়ুয়া এক ছেলেকে নিয়ে তিন বেলা খাবার খরচ জুটে যেত। করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে তাঁর জীবন–জীবিকায় টান পড়েছে। বিক্রি না থাকায় দুর্বিষহ দিন কাটাতে হচ্ছে।
৭১ বছর বয়সী আবদুল কাদের নাটোর শহরের উত্তর পটুয়াপাড়া (২ নম্বর ওয়ার্ড) মহল্লার মৃত চাঁদ আলী মুন্সির ছেলে। নাটোর আদালত চত্বরে ভেষজ উদ্ভিদ বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন তিনি।
প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বিক্রি হতো। ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লাভ থাকত। তা দিয়ে অসুস্থ স্ত্রী ও কলেজপড়ুয়া এক ছেলেকে নিয়ে তিন বেলা খাবার খরচ জুটে যেত। করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে তাঁর জীবন–জীবিকায় টান পড়েছে। বিক্রি না থাকায় দুর্বিষহ দিন কাটাতে হচ্ছে।
মাঝের কয়েকটা দিন বাদে করোনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিক্রি নেই। এরই মধ্যে স্ট্রোক করে শরীরের বাঁ পাশ অবশ হয়ে পড়েছিল। পরিচিতজনদের কাছে কিছু ধারদেনা করে চলেছেন। ভীষণ কষ্টে যাচ্ছে তাঁর দিনকাল।আবদুল কাদের, ভেষজ গাছগাছড়া বিক্রেতা
আবদুল কাদের আগে বাড়ি থেকে রিকশা চেপে দোকান নিয়ে আদালত চত্বরে আসতেন। এখন টাকার অভাবে জীর্ণ শরীরে পায়ে হেঁটে চলাফেরা করেন। ১৫ দিন ধরে সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত খরিদ্দারের আশায় বসে থেকে শূন্য পকেটে তাঁকে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। কোনো কোনো দিন সাহ্রির খাবারও জোটে না। আবদুল কাদের বলেন, মাঝের কয়েকটা দিন বাদে করোনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিক্রি নেই। এরই মধ্যে স্ট্রোক করে শরীরের বাঁ পাশ অবশ হয়ে পড়েছিল। পরিচিতজনদের কাছে কিছু ধারদেনা করে চলেছেন। ভীষণ কষ্টে যাচ্ছে তাঁর দিনকাল। সহযোগিতা করার কথা বলে পাড়ার কিছু ছেলে ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে গেছে। তবে কোনো সহযোগিতা মেলেনি।
আবদুল কাদেরের অস্থায়ী ভেষজ উদ্ভিদের দোকানের পাশেই আইনজীবী লুৎফর রহমানের চেম্বার (বার ভবন)। এই আইনজীবী বললেন, ‘১০ বছরের বেশি সময় ধরে এই চাচাকে এখানে গাছগাছড়া বিক্রি করতে দেখছি। কোনো দিন আর্থিক সহযোগিতা চান না। এখনো তিনি চান না। তবে তাঁর অবস্থা দেখে মনে হয় তিনি ভীষণ আর্থিক অনটনে আছেন। সরকারি বিধিনিষেধের কারণে আদালতে তেমন কেউ আসে না। ফলে তাঁর বিক্রিও হয় না।’
আবদুল কাদেরের মতো আদালত চত্বরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকান শ্রমিকদের অবস্থা খুবই শোচনীয় বলে জানালেন নাটোর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল হক। তিনি আরও বলেন, তাঁদের অবস্থা যেন আলোর নিচে অন্ধকার। এই চত্বরেই জেলা প্রশাসক এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কার্যালয়। সেখান থেকে সারা জেলায় কোটি কোটি টাকার সহযোগিতা করা হচ্ছে। অথচ আবদুল কাদেরদের প্রতি কারও দৃষ্টি পড়ে না।