
খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল ছাড়া খুলনা বিভাগের সরকারি কোনো হাসপাতালে রক্তের উপাদান আলাদা করার যন্ত্র ‘ব্লাড সেল সেপারেটর’ নেই। অথচ খুমেক হাসপাতালের সেই যন্ত্র সাত মাসের বেশি সময় ধরে বিকল হয়ে আছে।
এ অবস্থায় রক্তের জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ও স্বজনেরা পড়েছেন বিপাকে। রক্তদাতা খুঁজে বের করার মতো কঠিন কাজের পাশাপাশি তাঁদের বেশি টাকা খরচ করে বাইরে থেকে এ সেবা নিতে হচ্ছে।
চিকিৎসকেরা জানান, ‘ব্লাড সেল সেপারেটর’ বা ‘রেফ্রিজারেটেড সেন্ট্রিফিউজার’ নামের ওই যন্ত্র দিয়ে রক্তের লোহিত কণিকা, অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেট ও প্লাজমা আলাদা করা যায়। রক্তদাতার কাছ থেকে যে পরিমাণ রক্ত সংগ্রহ করা হয়, তার পুরোটা অধিকাংশ সময় রোগীর লাগে না। কোনো রোগীর শুধু রক্তরস প্রয়োজন। কারও আবার শুধুই রক্তকণিকা প্রয়োজন। কারও শুধুই প্লাটিলেট দরকার। রক্তের উপাদান ভাগ করে ব্যবহার করলে এক ইউনিট রক্ত অন্তত তিনজন রোগীর চিকিৎসার কাজে লাগতে পারে। কিন্তু উপাদান আলাদা করার যন্ত্রটি নষ্ট থাকায় সুনির্দিষ্ট উপাদান না দিয়ে অনেক সময় পুরো রক্ত দিতে হচ্ছে রোগীকে। এতে একদিকে যেমন রক্তের অপচয় হচ্ছে, আবার অনেক সময় রোগীরা নতুন জটিলতায় পড়ছেন।
যন্ত্রটি দ্রুত সচল করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রক্তের উপাদান আলাদা করার জন্য ২০০২ সালের ৫ মার্চ হাসপাতালে ‘ব্লাড সেল সেপারেটর’ যন্ত্রটি স্থাপন করা হয়। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে যায়। এরপর ২০১৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নতুন একটি যন্ত্র চালু করা হয়। চালুর ছয় মাসের মধ্যে যন্ত্রটি নষ্ট হলে পরে হাসপাতালে রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের নিজস্ব অর্থায়নে ঠিক করা হয়। ২০১৬ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ওই যন্ত্রের মাধ্যমে পুনরায় সেবা দেওয়া শুরু হয়। এরপর আরও কয়েক দফায় বিকল হওয়া ও চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে চলছিল। সর্বশেষ ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে এখনো যন্ত্রটি বিকল হয়েই পড়ে আছে।
সূত্র জানায়, ডেঙ্গুর মৌসুমে প্লাটিলেটের চাহিদা বাড়ে। তবে রক্তের বিভিন্ন উপাদানের আলাদা চাহিদা থাকে সারা বছরই। যন্ত্রটি চালু অবস্থায় প্রতিদিন খুলনা অঞ্চলের ৩০-৪০ জন থ্যালাসেমিয়া, লিউকোমিয়া, লিভার সিরোসিসসহ রক্তরোগের রোগীরা এর থেকে সেবা নিতে পারতেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক এস এম কামাল প্রথম আলোকে বলেন, যন্ত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময়ই যন্ত্রটির খুবই দরকার পড়ে। ইডিওপ্যাথিক থ্রম্বোসাইটোপেনিক পারপুরা (আইটিপি), ডেঙ্গুসহ কিছু ধরনের রোগে রোগীকে শুধু প্লাটিলেট দিতে হয়। ‘হোল ব্লাড’ দিলে অসুবিধা। নগরে আদ-দ্বীন নামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে রক্তের উপাদান আলাদা করার যন্ত্র আছে, উপায় না থাকলে সেখানে রোগীদের পাঠানো হয়। তবে সেটাও মাঝেমধ্যেই নষ্ট থাকে। সরকারি হাসপাতালের দরকারি যন্ত্রটি নষ্ট থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে প্রয়োজন মেটাতে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক রোগীর স্বজন বলেন, খুমেক হাসপাতালে যন্ত্রটি থাকার সময় সেখান থেকে তাঁরা সেবা নিতেন। কিন্তু নষ্ট হওয়ার পর বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সেবা নিতে হচ্ছে। এর জন্য মাঝেমধ্যে খুলনার বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে প্রচুর অর্থ খরচ হচ্ছে, করোনার এই সময়ে রক্তদাতা ঠিক করাসহ অন্য ঝামেলা তো আছেই।
খুলনায় থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের একজন খালিশপুরের ফারহান কাইফ। বিটা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ফারহানের জন্য শুধু রক্তের রেড সেল (প্যাট সেল ভলিউম) অংশটিই লাগে। মাসে দুই থেকে চারবার তাঁকে রক্ত দিতে হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা তাঁকে ‘হোল ব্লাড’ দিতে নিষেধ করেছেন। এতে রোগীর বিভিন্ন অঙ্গে অতিরিক্ত আয়রন জমে যাওয়াসহ বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
ফারহান কাইফের মা শিরোপা পারভীন বলেন, আগে যশোর রেড ক্রিসেন্ট থেকে রক্তের উপাদান আলাদা করে আনতেন। পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যন্ত্রটি ঠিক হলে সেখান থেকেই কাজ হতো। এখন আবার প্রতি সপ্তাহে সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে রক্ত নিয়ে যশোর রেড ক্রিসেন্টে যেতে হয়। উপাদান আলাদা করে খুলনায় ফিরতে সাড়ে ৩টা-৪টা বাজে। সেই রক্ত আবার খুলনার একটি ক্লিনিক থেকে শরীরের পরিসঞ্চালন করা হয়। সব মিলিয়ে প্রতিবারে খরচ পড়ে প্রায় তিন হাজার টাকার বেশি। লকডাউনে খরচ ও বিড়ম্বনা বেড়েছে। প্রতি সপ্তাহে নতুন রক্তদাতা খুঁজে বের করাটা একটা যুদ্ধ। এর সঙ্গে যশোর-খুলনায় ছোটাছুটি করা আরেক যুদ্ধ। আর খরচের কথা বলে কী হবে?
খুমেক হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, যন্ত্রটি পুরোনো হওয়ায় বারবার বিকল হচ্ছে। যন্ত্রটি দিয়ে বিনা মূল্যে রোগীদের সেবা দেওয়া হতো। ডেঙ্গুর প্রকোপের সময় এই যন্ত্র দিয়ে অসংখ্য রোগীর শরীরে প্লাটিলেট দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া থ্যালাসেমিয়াসহ অন্য রোগীরা তো সেবা নিতেনই। তিনি আরও বলেন, যন্ত্রটি দ্রুত মেরামতের জন্য এ পর্যন্ত পাঁচ দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে চিঠি দেওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ নতুন আরেকটি ব্লাড সেল সেপারেটর মেশিন দেওয়া হবে।