
নীলফামারীতে ট্রেনে কাটা পড়ে একই পরিবারের তিন শিশুসহ চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম। আজ শনিবার বেলা ১টার দিকে সদর উপজেলার কুন্দপুকুর ইউনিয়নের বউবাজার গ্রামে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন তিনি। পরে তিনি নিহত তিন শিশুর বাড়িতে যান। এরপর স্থানীয় লোকজনের উদ্যোগে আয়োজিত এক শোকসভায় বক্তব্য দেন তিনি। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা নিহত তিন শিশুর বাবা রেজওয়ান আলী (২৬) ও ওই তিন শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে নিহত পাহারাদার সালমান ফারসির স্ত্রী সুমি আক্তারকে (২৫) রেলে চাকরি দেওয়ার জন্য দুটি আবেদনপত্র দেন।
রেলমন্ত্রী আবেদনপত্র দুটি গ্রহণ করেন। অস্থায়ীভাবে তাঁদের চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে উপস্থিত রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। এ সময় রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। একই পরিবারের তিনটি শিশু নিহত হয়েছে। ওই শিশুদের বাঁচাতে গিয়ে আরও একজন নিহত হয়েছেন। পরিবার দুটির যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা পুষিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। আমি রেলের মন্ত্রী হিসেবে সহমর্মিতা জানাতে এখানে এসেছি।’
রেলপথমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশ অনেক ঘনবসতিপূর্ণ। রেললাইনের ধারে অনেক জায়গা আছে, যেগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে না। অনেক ভূমিহীন পরিবার ওই সব জায়গায় ঘর তুলে আছে। যে তিনটি শিশু নিহত হয়েছে, ওই পরিবারটাও রেলের জায়গায় আছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগ নিয়েছেন ভূমিহীনদের ঘর করে দেওয়ার। সে কার্যক্রম চলমান আছে। হয়তো তাদেরও নাম আছে। অল্প সময়ে হয়তো তারা এখান থেকে চলে যাবে।’
স্থানীয় বাসিন্দারা নিহত তিন শিশুর বাবা এবং ওই তিন শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে নিহত পাহারাদারের স্ত্রীকে রেলে চাকরি দেওয়ার জন্য দুটি আবেদনপত্র দেন।
মন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে নিহত সালমান ফারসির পরিবারকে ২০ হাজার টাকা এবং নিহত ৩ শিশুর পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা দেন। এ সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষে সালমান ফারসির পরিবারকে আরও ২০ হাজার টাকা এবং তিন শিশুর পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত তিন শিশু হলো লিমা আক্তার (৭), শিমু আক্তার (৪) ও মো. মোমিনুর রহমান (২)। ওই তিন শিশুর বাবা রেজওয়ান আলী রিকশাচালক এবং মা মজিদা বেগম (২২) কারখানার শ্রমিক। ওই তিন শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে মারা যান মনসাপাড়া গ্রামের সালমান ফারসি ওরফে শামীম (৩০)। নিহত সালমান ফারসির পরিবারে রয়েছেন মা চিনু বেওয়া (৫০), স্ত্রী সুমি আক্তার (২৫) ও সাড়ে চার বছরের মেয়ে মিত্তাহুল জান্নাত।
এ সময় নীলফামারী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দেওয়ান কামাল আহমেদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মোক্তারুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আজাহারুল ইসলাম, সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিদ মাহমুদ, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন নাহার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুজার রহমান, সাধারণ সম্পাদক ওয়াদুদ রহমানসহ রেলের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রেজওয়ান আলীর বাড়ির পাশে তিস্তা সেচখালের দিনাজপুর খালের ওপর একটি রেলসেতুর সংস্কারকাজ চলছিল। ওই কাজের ইট নিয়ে সেখানে একটি ট্রলি আসে। ওই সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে শিশুরা ট্রলিটিকে দেখছিল। এ সময় চিলাহাটি থেকে ছেড়ে আসা রকেট মেইল ট্রেনটি খুলনার দিকে যাচ্ছিল। সকালে কুয়াশার কারণে বেশি দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল না। পাশাপাশি ট্রলির শব্দের কারণে ট্রেনের শব্দ বুঝতে পারেনি তারা।
অদূরেই ছিল ওই সেতুর সংস্কারকাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাহারাদার সালমান ফারসি। অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি দ্রুত সেখানে ছুটে যান বাচ্চাদের রক্ষা করতে। তিনি শিশু মোমিনুরকে কোলেও তুলে নেন। কিন্তু লাফ দেওয়ার আগেই ট্রেনের ধাক্কায় ছিটকে পড়েন।
লিমা ও শিমু ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা সালমান ফারসি ও শিশু মোমিনুরকে উদ্ধার করে নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁরাও মারা যান।