মেহেরপুরে ইউপি নির্বাচন

তিন ইউনিয়নে নৌকার বাধা ‘বিদ্রোহীরা’

আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীদের প্রচারণা চোখে পড়ার মতো। ভোটাররা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের আওয়ামী লীগের গলার কাঁটা হিসেবে মন্তব্য করছেন।

মেহেরপুর সদর উপজেলায় চারটি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রচার জমে উঠেছে। এর মধ্যে পিরোজপুর, বারাদি ও আমঝুপি ইউপিতে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। দল থেকে যাঁরা নৌকার প্রতীক পেয়েছেন, তাঁদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’। নৌকার প্রতীক পেয়েও বিদ্রোহীদের দাপটে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন শ্যামপুর ইউপির এক চেয়ারম্যান প্রার্থী।

১৫ জুন এই চার ইউপিতে ভোট গ্রহণ হবে। সদর উপজেলার বারাদি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোমিনুল ইসলাম। কিন্তু দলের দুজন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন। এর মধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আরমান আলী ঘোড়া ও জেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক সালেহ আল আজিজ আনারস প্রতীকে লড়ছেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন হাসিবুল হাসান (চশমা), নুরু উস সাফা (মশাল) ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সাবেক ইউনিয়ন আমির নুর ইসলাম (রজনীগন্ধা)।

নিজ দলের বিদ্রোহীদের বিষয়ে নৌকা প্রতীক পাওয়া মোমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দলের প্রতি যাঁদের আস্থা, বিশ্বাস ভালোবাসা থাকে না, তাঁরাই বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে দলের বিপক্ষে কাজ করছেন। মূলত দল থেকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা আরোপ না করার কারণে বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনে একাধিক বিদ্রোহী দেখা যাচ্ছে। দল বিদ্রোহীদের চিহ্নিত করে দৃশ্যমান কঠোর শাস্তি প্রদান করলে কোনো এলাকায় বিদ্রোহী প্রার্থী দেখা যাবে না।

পিরোজপুর ইউপিতে আওয়ামী লীগের টিকিট পেয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুস সামাদ ওরফে বাবলু বিশ্বাস। তিনি জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের ভগ্নিপতি। স্বতন্ত্র হিসেবে এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুস সালাম। তাঁর প্রতীক আনারস। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আবু বক্কর সিদ্দিক নামের একজন লড়ছেন হাতপাখা প্রতীকে।

আমঝুপি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের নৌকা পেয়েছেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বোরহান উদ্দিন আহমেদ। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন মডেল আসিফ আজিম (আনারস)। তিনি আওয়ামী লীগের কোনো পদ–পদবিতে না থাকলেও তাঁর পরিবারের লোকজন সরকারদলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া এই ইউনিয়নে ঘোড়া প্রতীকে লড়ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম (ঘোড়া)। তিনি সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলামের ছোট ভাই।

ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেহেরপুর সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়নে দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা। এর মধ্যে বিদ্রোহীদের সঙ্গে পেরে না ওঠায় নৌকা প্রতীক পেয়েও মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন নবগঠিত শ্যামপুর ইউনিয়নের আবদুর রব বিশ্বাস। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রবীণ নেতা। নির্বাচনী এলাকাগুলোতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীদের প্রচারণা চোখে পড়ার মতো। ভোটাররা বিদ্রোহী প্রার্থীদের আওয়ামী লীগের গলার কাঁটা হিসেবে মন্তব্য করছেন।

দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে বারাদি ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নিয়ে আরমান আলী বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে দল করে আসছি। গত থানা আওয়ামী লীগের কমিটিতে সদস্য ছিলাম। দলের জন্য জেলজুলুম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। দল ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করতে পারেনি। দলের জন্য নিবেদিত প্রাণগুলোর প্রতি সম্মান রেখে নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। এভাবে ঢালাও মনোনয়ন দেওয়ার কারণে অনেক ত্যাগী নেতা বিদ্রোহী হয়েছেন। এতে দল যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’

পিরোজপুর ইউনিয়নে স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়ানো আওয়ামী লীগ নেতা আবদুস সালাম বলেন, যাঁরা তৃণমূল নেতা–কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রেখেছেন, তাঁরাই দলীয় মনোনয়ন বাগিয়ে আনেন। তৃণমূল জনগণের দাবি ও অধিকার সংরক্ষণে বিদ্রোহী হতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানালেন সালাম।

আমঝুপি ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান ও সদর আওয়ামী লীগের সভাপতি বোরহান উদ্দিন বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মদদে বিদ্রোহী প্রার্থীর জন্ম হচ্ছে।

এ বিষয়ে মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ খালেক বলেন, যাঁরা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন, তাঁদের পদ–পদবি ও নাম লিখে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। কেন্দ্র তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।