
নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় কৃষক আবদুল মোতালিবের মরিচখেতে জালের বেড়ায় বিরল প্রজাতির একটি গন্ধগোকুলছানা আটকা পড়েছিল। পরিবেশ ও বন্য প্রাণী রক্ষায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সেভ দ্য অ্যানিমেলস অব সুসং’-এর সদস্যরা প্রাণীটি উদ্ধার করে আজ বুধবার সন্ধ্যায় পাহাড়ে অবমুক্ত করেছে।
এলাকাবাসী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্গাপুর পৌরসভার মাকরাই এলাকার কৃষক আবদুল মোতালেবের বাড়ির সামনে একটি মরিচখেত আছে। গরু-ছাগলের উপদ্রব থেকে খেতের রক্ষায় সম্প্রতি চারপাশে প্লাস্টিকের জাল দিয়ে বেড়া দেন তিনি। আজ দুপুরে তিনি খেতে গিয়ে জালে আটকা পড়া একটি বিরল প্রজাতির প্রাণী দেখে ভয় পেয়ে যান। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রাণীটি দেখতে সেখানে ভিড় করেন। খবর পেয়ে ‘সেভ দ্য অ্যানিমেলস অব সুসং নামের’ সংগঠনের সদস্যরা গিয়ে প্রাণীটি উদ্ধার করেন। প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে নিয়ে প্রাণীটিকে চিকিৎসক দেখিয়ে সন্ধ্যায় গোপালপুর পাহাড়ে অবমুক্ত করা হয়।
কৃষক আবদুল মোতালেব প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ধারণা, রাতে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে জালে আটকা পড়েছিল প্রাণীটি। বিড়াল আকৃতির প্রাণীটি দেখে প্রথমে তিনি ভয় পেয়ে যান। এলাকাবাসী প্রাণীটি মেরে ফেলতে চাইছিল, কিন্তু তিনি বাধা দেন। পরে ‘সেভ দ্য অ্যানিমেলস অব সুসং’-এর সদস্যরা এসে প্রাণীটি উদ্ধার করে নিয়ে যান।
সংগঠনটির সভাপতি রিফাত আহমেদ বলেন, গন্ধগোকুলটি আকারে অনেকটাই ছোট। এটি একটি ছানা। ওজন এক কেজির মতো হবে। নিশাচর প্রাণী হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, রাতে খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়ে জালে আটকে যায়। তাঁদের দীর্ঘক্ষণের প্রচেষ্টায় অক্ষতভাবে প্রাণীটি উদ্ধার করে পাহাড়ে অবমুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, উপজেলাটি পাহাড়ি জনপদ হওয়ায় মাঝেমধ্যেই অজগর, লজ্জাবতী বানর, মেছো বাঘসহ বিভিন্ন বিরল প্রজাতির প্রাণী লোকালয়ে দেখা যায়।
নেত্রকোনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও বন্য প্রাণী গবেষক মো. নুরুল বাসেত প্রথম আলোকে বলেন, এ অঞ্চলে একসময় প্রচুর গন্ধগোকুল পাওয়া গেলেও বর্তমানে চোখে পড়েই না। গন্ধগোকুল শত্রু দেখলে একধরনের কাঁদানে গ্যাস স্প্রে করে, এটি প্রাণীটির আত্মরক্ষার হাতিয়ার। পাশাপাশি আরও একটি গ্রন্থি আছে, সেটি থেকে একধরনের আঠালো সুগন্ধি রস বের হয়। এরা দেখতে পোষা বিড়ালের মতোই—খাটো পা, লম্বা লেজ ও শরীর বাদামি রঙের। লেজে সাতটি চওড়া কালো বলয় আছে, গলার নিচে দুটি কালো চওড়া টান, পিঠের ওপর থেকে মেরুদণ্ড বরাবর মোট ছয়টি লম্বা বাদামি রেখা।
নুরুল বাসেত আরও বলেন, নিরীহ স্বভাবের এই প্রাণীকে গন্ধগোকুল, ছোট বাগডাশ, ছোট খাটাশ, গন্ধগুলা, হাইলটালা ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। শরীরের মাপ লেজসহ ৯০ সেন্টিমিটার। ঘাড় থেকে উচ্চতা ২২ সেন্টিমিটার। ওজন ২-৩ কেজি। এদের আয়ুষ্কাল প্রায় ১৫ বছর। এরা ঝোপঝাড়, বাগান ও ঘরবাড়ির ছাদে বাসা বাঁধে। ধানখেতের ইঁদুর, গেছো ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, পাখি ও পাখির ডিম, ব্যাঙ-শামুক ও ফল খায়। তাল-খেজুরের রস এদের প্রিয় পানীয়। বছরে কমপক্ষে দুবার ছানা দেয় এরা।
এই বন্য প্রাণী গবেষক জানান, গন্ধগোকুল একটি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। ২০০৮ সাল থেকে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) প্রাণীটিকে বিপন্ন (লাল তালিকাভুক্ত) ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-১ অনুযায়ী প্রজাতিটি সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে।