
কাইলানী ও টগার হাওরের অবস্থান সুনামগঞ্জের ধরমপাশা উপজেলায়। গত বোরো মৌসুমে এই দুই হাওরের একটিতে তিন কিলোমিটার ও অপরটিতে সাত কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। দুই সপ্তাহ ধরে সেই বাঁধ দুটি কেটে সড়ক নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বাঁধ কেটে সড়ক নির্মাণ করায় অকালবন্যায় হাওরে পানি ঢুকে বোরো ফসলহানির আশঙ্কা প্রকাশ করছেন কৃষক ও পাউবো কর্তৃপক্ষ।
উপজেলা প্রশাসন, এলজিইডি ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, মধ্যনগর ইউনিয়নের সম্পদপুর গ্রামের সামনে থেকে চামরদানী ইউনিয়নের সোলেমানপুর গ্রামের সামনে পর্যন্ত কাইলানী হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধটির দৈর্ঘ্য প্রায় তিন কিলোমিটার। আর চামরদানী ইউনিয়নের টেবিরকোনা গ্রামের সামনে থেকে রামদিঘা গ্রামের সামনের পর্যন্ত টগার হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধটির দৈর্ঘ্য প্রায় সাত কিলোমিটার। গত বোরো মৌসুমে পাউবোর আওতায় এই দুটি বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতকাজ করা হয়েছে। এলজিইডির হাওর অঞ্চলের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে সেখানে দুই সপ্তাহ ধরে ডুবন্ত সড়ক নির্মাণকাজ চলছে। এই কাজে পাউবোর কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সম্পদপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কৃষক নিরঞ্জন তালুকদার বলেন, ফসলরক্ষা বাঁধের উচ্চতার চেয়েও নিচু করে সড়ক নির্মাণকাজ চলছে। এতে করে অকালবন্যায় সড়কের ওপর দিয়ে পানি ঢুকে হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যাঁরা সড়কে কাজ করছেন, তাঁদের বাঁধের চেয়ে আরও দুই ফুট উঁচু করে মাটি কেটে সড়ক নির্মাণকাজ করার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু এতে কেউ কোনো কান দিচ্ছেন না।
টেবিরকোনা গ্রামের কৃষক আতিকুল মিয়া (৩০) বলেন, ‘যেইভাবে সড়কটার কাম অইতাছে এইভাবে সড়কটা দিয়া ফসলরক্ষার জন্য কুনু উপকার অইতোনা। হানি আইলেই ফসলের বারোডা বাইজা যাইব।’
পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী ও ধরমপাশায় ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতকাজ তদারকি কমিটির সদস্যসচিব মাহমুদুল ইসলাম বলেন, এই দুটি ফসলরক্ষা বাঁধই পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে। বাঁধ কেটে সড়ক নির্মাণকাজে কোনো রকম অনুমতি নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে সড়ক নির্মাণের কাজ করা হচ্ছে। কোথাও উঁচু আবার কোথাও নিচু করে সড়ক নির্মাণকাজ করায় এ নিয়ে হাওরের আগামী বোরো ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ঘটনায় সপ্তাহখানেক আগে উপজেলা প্রকৌশলীকে মৌখিতভাবে বলা হলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি।
এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী মো. আরিফ উল্লাহ খান বলেন, ‘কোথাও ফসলরক্ষা বাঁধ কেটে ডুবোসড়ক নির্মাণকাজ করা হচ্ছে না। যেখানে সড়ক নির্মাণের কাজ করছি সেখানে এলজিইডির এলাইনমেন্টের মধ্যেই রয়েছে। যদি কোথাও পাউবো ও এলজিইডির এলাইনমেন্ট এক হয়ে যায়, তাহলে ফসলরক্ষা বাঁধের উচ্চতা ঠিক রেখেই ডুবোসড়ক নির্মাণকাজ করা হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমান বলেন, এভাবে সড়ক নির্মাণ হলে হাওরের আগামী বোরো ফসল অনেকটাই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে বলে এলাকার কৃষকেরা জানিয়েছেন। সড়কের আগে হাওরের ফসলরক্ষায় বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বিষয়টি শিগগিরই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হবে।
জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি গত সোমবার দুপুরে সরেজমিনে ওই দুটি ফসলরক্ষা বাঁধ পরিদর্শন করেছেন। ফসলরক্ষা বাঁধ কেটে সড়ক নির্মাণ করার বিষয়টি তিনি নিজে দেখেছেন। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। কৃষকদের হাওরের ফসলরক্ষা করতে গিয়ে যা যা করতে হয়, তা–ই করা হবে।