
জলাভূমি সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের ওপর এবার গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু রাজশাহী শহরে তালিকাভুক্ত জলাভূমিও ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
রাজশাহী নগর একটি চরমভাবাপন্ন এলাকা। এখানে শীতের সময় শীত বেশি, গরমের সময় গরম বেশি লাগে। পরিবেশবিদদের ভাষ্য, কংক্রিটের ভিড়ে পুকুর-দিঘি তাপ শোষণ ও পানির স্তর ধরে রাখতে সহায়তা করে; কিন্তু রাজশাহী নগরে বেআইনিভাবে এগুলো ভরাট করে ফেলায় পরিবেশের ভারসাম্য হারিয়ে যেতে বসেছে।
জলাশয় ভরাটের বিরূপ প্রভাব থেকে নগরের পরিবেশ রক্ষার জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে একটি মেগা পরিকল্পনার আওতায় নগরের ব্যক্তিমালিকানাধীন ২২টি পুকুর সংরক্ষণের তালিকা করা হয়েছে। প্রকল্পটি এখনো প্রক্রিয়াধীন, কিন্তু তালিকাভুক্ত পুকুরও এখন ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে ২ ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে বিশ্ব জলাভূমি দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য, ‘জলাভূমি, জীবন ও প্রকৃতির জন্য কাজ’। জলাভূমি সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের ওপর এবার গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, শহরে উন্মুক্ত জায়গা বাড়ানো সম্ভব হলেও, জলাশয় বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
মানুষের ব্যবহার, অগ্নিনির্বাপণ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য নগরে পর্যাপ্ত জলাভূমি থাকা প্রয়োজন। পরিবেশবাদীদের ভাষ্য, জলাভূমিতে বৃষ্টির পানি ধারণ করে তার মাধ্যমেই মাটির নিচের পানির স্তর ধরে রাখা সম্ভব। মাটির নিচের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে গেলে শহর দেবে যেতে পারে। শুধু জলাশয়ের মাধ্যমেই পানির এই স্তর পুনরায় ভরাট হতে পারে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলার রাজশাহী বিভাগীয় সমন্বয়কারী তন্ময় কুমার সান্ন্যাল বলেন, রাজশাহীর বোয়ালিয়া ভূমি অফিসের ২০১৪ সালের জরিপ অনুযায়ী কাগজে-কলমে শহরে এক হাজার পুকুর ছিল। বাস্তবে এই পুকুরের সংখ্যা এখন ২০০-এর নিচে নেমেছে। ফলে এখন রাজশাহী শহরের আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন। শীতের সময় শীত বেশি অনুভূত হয়, গরমের সময় বেশি গরম।
তন্ময় কুমার সান্ন্যাল বলেন, জলাধারগুলো শীত-গ্রীষ্ম উভয় মৌসুমেই তাপ শোষণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এ ছাড়া মাটির নিচের পানির স্তর পুনরায় ভরাটেও সহায়তা করে; কিন্তু জলাভূমি ভরাট হলে এমনও হতে পারে, শহরে বড় পরিসরে লাগা আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত পানি মিলবে না। তাপমাত্রার ভারসাম্য না থাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।
দেশের জলাধার ও পরিবেশ সংরক্ষণের আইন আছে। তন্ময় কুমার বলছেন, সে আইনের তোয়াক্কা না করে রাতের অন্ধকারে শহরের জলাশয়গুলো ভরাট করে ফেলা হচ্ছে।
২০১৯ সালের ২৩ মার্চ রাজশাহী নগরের কাজীহাটা এলাকার একটি পুকুর ভরাটের বিরুদ্ধে স্থানীয় ব্যক্তিরা মানববন্ধন করেছিলেন। তখন রাতের অন্ধকারে পুকুরটি ভরাট করে ফেলা হচ্ছিল। পুকুরটি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেগা পরিকল্পনার তালিকাভুক্ত ২২টি পুকুরের একটি। এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ভরাট কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। তবে ২০২০ সালের এপ্রিলে পুকুরটি ভরাট করে ফেলা হয়। এখন সেখানে কলাবাগান করা হয়েছে। একইভাবে নগরের সপুরা এলাকায় ছয়ঘাটি দিঘিটিও রাতের অন্ধকারে মাটি ফেলে ভরাট করা শুরু হয়েছে।
রাজশাহীর পরিবেশবাদী সংগঠন হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি মাহাবুব সিদ্দিকী ২০১০ সালে নগরের পুকুর ভরাটের বিরুদ্ধে আদালতে একটি রিট করেছিলেন। তখন তিন মাসের জন্য আদালত নগরে পুকুর ভরাটের জন্য স্থগিতাদেশ দেন। এই রিটের এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, কিন্তু পুকুর ভরাট অব্যাহত আছে।
রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) বেআইনিভাবে পুকুর ভরাটের বিরুদ্ধে এর আগে তিনটি মামলা করেছিল। আরডিএর অথরাইজড অফিসার (জোন-১) আবুল কালাম আজাদ বলেন, কোনো শহরের উন্মুক্ত জায়গা কতটুকু রাখা উচিত, তা নির্ভর করে শহরের জনসংখ্যার ঘনত্বের ওপর। যেমন রাজশাহী শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রতি একরে ৮৪ জন বাস করেন। আবার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে বাস করেন ৪ জন। বর্তমানে জলাশয় যে পরিমাণ আছে, তা সংরক্ষণ ও ব্যবহারের উপযোগী করতে পারলেও রাজশাহী নগরের জন্য ভালো হবে।