ঠাকুরগাঁওয়ে পনির উৎপাদনের ঐতিহ্য না থাকলেও সফল হয়েছেন মাসুমা খানম। খরচ বাদ দিয়ে মাসে লাভ থাকে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা।

আর দশজন গৃহবধূর মতো হলেও তাঁর একটি বিশেষ দিক আছে। সংগ্রাম করে শুধু নিজে সফল হননি, এলাকার অসহায় নারীদের সংসারের অভাবও দূর করেছেন। তৈরি করেছেন কর্মসংস্থান। ঠাকুরগাঁওয়ের নিশ্চিন্তপুর এলাকার ওই গৃহবধূর নাম মাসুমা খানম। দুধ থেকে পনির তৈরি করে এখন তিনি সফল উদ্যোক্তা।
ঠাকুরগাঁওয়ে গরুর দুধ থেকে তৈরি পনিরের কোনো ঐতিহ্য না থাকলেও বাণিজ্যিকভাবে তা উৎপাদন করতে গিয়ে সফল হয়েছেন মাসুমা। এ জন্য স্বীকৃতিও পেয়েছেন। গত শনিবার শহরের নিশ্চিন্তপুরের কারখানায় মাসুমার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। আলাপে জানা যায় তাঁর কাজ শুরুর কথা।
ঠাকুরগাঁও শহরের নিশ্চিন্তপুর এলাকায় একটি বেসরকারি সংস্থার পনির কারখানা ছিল। কিন্তু লোকসানে কারখানাটি বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এতে পনির উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত নারী শ্রমিকেরা বেকার হয়ে পড়েন। সে সময় মাসুমাকে বড় ছেলে তারিকুল ইসলাম ওই কারখানায় পনির উৎপাদনের পরামর্শ দেন। ছেলের কথা শুনে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে ঋণ নেন মাসুমা। ২০১২ সালে ২৭ লিটার দুধ দিয়ে কারখানায় পনির উৎপাদন শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁর কারখানায় উৎপাদিত পনিরের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। আয় ও ব্যবসার পরিধিও বেড়ে যায়। এখন ওই কারখানায় এক দিনে প্রায় ২ হাজার ২০০ লিটার দুধের পনির উৎপাদন হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে লাভ হয় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা।
নিশ্চিন্তপুরের এ কারখানা ছাড়াও মাসুমা আরও দুটি কারখানা গড়ে তুলেছেন। নতুন ওই দুটি কারখানায় আড়াই হাজার লিটার দুধের পনির তৈরি হয়। উৎপাদিত পনির চলে যায় দেশের বিভিন্ন এলাকায়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হোটেল ও ফাস্ট ফুডের দোকানে তাঁর উৎপাদিত পনিরের বেশ চাহিদা আছে বলে জানান তিনি।
তবে এই কর্মযজ্ঞের আগের গল্পটা ছিল ভিন্ন রকম। বাঙালি গৃহবধূ শব্দ শুনেই চোখে যে ছবি ভেসে ওঠে, মাসুমা খানমও একসময় তেমন ছিলেন। ঠাকুরগাঁওয়ে আসার আগে থাকতেন বিক্রমপুরে। ১৯৭৫ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭৭ সালে লৌহজং পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের শরীরচর্চা শিক্ষক ইয়ার মাহমুদ খানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ১৯৮২ সালে ইয়ার মাহমুদ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর পেটে অস্ত্রোপচার করতে হয়। এরপর চাকরিটা আর করা হয় না। দুই সন্তান আর অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে চলে আসেন ঠাকুরগাঁও শহরে ননদের বাসায়। সেই থেকে ননদের স্বামীর সঙ্গে কখনো পুরোনো কাপড়ের ব্যবসা, কখনো পুরোনো লোহা কেনাবেচার ব্যবসা করতে শুরু করেন। এরই মধ্যে বড় ছেলে তারিকুল ইসলাম ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়ে যান। ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় যাওয়া পনির তিনিই বাজারজাত করার কাজ করেন।
মাসুমা খানম এখন ঠাকুরগাঁওয়ে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ পনির উৎপাদনকারীদের একজন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে এখন এক শর বেশি লোক কাজ করেন, যাঁদের বেশির ভাগই অসহায় নারী। তাঁরা প্রতি মাসে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে আয় করেন।
মাসুমার পনির কারখানায় কাজ করেন নিহার পারভিন। তিনি বলেন, ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে দুর্বৃত্তের হামলায় তাঁর স্বামী নিহত হন। পরিবার নিয়ে তখন বিপদে পড়েন। বিষয়টি জানার পর মাসুমা তাঁকে কাজ দেন।
মাসুমার কারখানায় বিপদে পড়া নারীরা এলে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। মাসুমা বলেন, নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে তিনি কারখানা আরও সম্প্রসারণ করতে চান। সেখানে কাজ করার সুযোগ পাবেন সমাজের অসহায়, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত নারীরা।
মাসুমা খানমের কারখানায় দুধের জোগান দিয়ে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়েছেন নিশ্চিন্তপুর এলাকার অনেক দুগ্ধ খামারি। নিজের সচ্ছলতার পাশাপাশি অন্যদের আয়ের ক্ষেত্র তৈরি করার স্বীকৃতিও পেয়েছেন। ২০১৭ সালে মাসুমাকে ‘শ্রেষ্ঠ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা’ পুরস্কার দেয় সিটি ফাউন্ডেশন।