ফরিদপুরে পাট চাষে ফিরেছে সুদিন

ফরিদপুরের আবহাওয়া ও মাটি পাট চাষের জন্য উপযোগী। গত এক বছরে পাটের উৎপাদন বেড়েছে ১০ হাজার ৭৬৩ মেট্রিক টন
ছবি: প্রথম আলো

পাটের রাজধানীখ্যাত ফরিদপুরে প্রতিবছরই বাড়ছে পাট চাষ। জেলাটিতে অনেকে পাট চাষ করেন বংশপরম্পরায়। এর মধ্যে পাটের চাহিদা বেড়েছে, বাড়ছে পাটের দাম। এতে ‘সোনালি আঁশ’-এর আবাদ নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন কৃষকেরা।

জেলা কৃষি কার্যালয় বলছে, ফরিদপুরের আবহাওয়া ও মাটি পাট চাষের জন্য উপযোগী। গত এক বছরে পাটের উৎপাদন বেড়েছে ১০ হাজার ৭৬৩ মেট্রিক টন। তোষা জাতীয় পাট চাষের দিক থেকে ফরিদপুর দেশের শীর্ষে রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে রয়েছে রাজবাড়ী, পাবনা, মাগুরা, কুষ্টিয়া, মাদারীপুর, যশোর, মেহেরপুর গোপালগঞ্জ ও ঝিনাইদহ।

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাজারদিয়া ইউনিয়নের মুড়াটিযা গ্রামের পাটচাষি সত্তরোর্ধ্ব মোকাররম মিয়া বলেন, ‘বংশপরম্পরায় আমরা পাটের আবাদ করে আসছি। পাট চাষ, পাট আবাদ করে আসছি। তা ছাড়া পাট চাষের জন্য এ অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া জুতসই। পাট চাষ না করলে খাব কী।’

খরচের বিষয়টি তুলে ধরে পাটচাষি হরিদাস বিশ্বাস বলেন, পাট উৎপাদনে মণপ্রতি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়। বিক্রি করার সময় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকার বেশি পাওয়া যায় না। পাটের দাম বাড়ে পাট মৌসুম চলে যাওয়ার পর, তখন কৃষকদের ঘরে পাট থাকে না।

ফরিদপুরের আবহাওয়া ও মাটি পাট চাষের জন্য উপযোগী

ফরিদপুর সদরের অম্বিকাপুর ইউনিয়নের পূর্ব ভাষাণচর গ্রামের শাহজাহান মণ্ডল বলেন, বীজ ও সারের নিশ্চয়তা এবং কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকি পেলে তাঁরা পাঠ চাষে আরও মনোযোগী হবেন। মাঝেমধ্যে এসবের সংকটে পড়তে হয় তাঁদের। এগুলোর সমাধান হওয়া জরুরি।

আরও কয়েকজন পাটচাষির সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, পাটের বীজ তাঁরা বাজার থেকে কিনে থাকেন। বীজ ও সারের দাম নাগালের মধ্যেই থাকে। তবে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে আসেন না। আবার অফিসে গিয়েও তাঁদের নাগাল পাওয়া কষ্টসাধ্য।

এ বিষয়ে ফরিদপুরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হযরত আলী বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের নানা স্থানে ঘোরাফেরা করতে হয়। আমি কৃষকদের বলব উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মুঠোফোন নম্বর সংরক্ষণ করতে। তাহলে বিপদের সময় ফোন করে সহজেই কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে পাবেন কৃষক।’

ফরিদপুরের কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, গত ১৩ বছরের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ফরিদপুরে ৭৫ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করা হয়। ওই অর্থ বছরে পাটের উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫১ মেট্রিক টন। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে পাটের আবাদ করা হয়েছে ৮৫ হাজার ৭৭ হেক্টর জমিতে। এ থেকে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৮২০ মেট্রিক টন।

পাটের চাহিদা বেড়েছে, বাড়ছে পাটের দাম। এতে ‘সোনালি আঁশ’-এর আবাদ নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন কৃষকেরা

১৩ বছরের মধ্যে গত ২০২০-২১ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ৮৫ হাজার ২০১ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছিল। ওই বছর প্রথমে খরা, পোকা ধরা, পরে অতিবৃষ্টি ও সর্বশেষ শিলাবৃষ্টির কারণে পাটের উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭ মেট্রিক টন। তবে ওই বছর পাটের ভালো দাম পেয়েছেন কৃষক। দাম বাড়তে বাড়তে

একপর্যায়ে প্রতি মণ সাত হাজার টাকায়ও বিক্রি হয়েছে। আগের বছর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১২৪ হেক্টর কম জমিতে কম জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন গত অর্থবছরের তুলনায় ১০ হাজার ৭৬৩ মেট্রিক টন বেশি হয়েছে।

পাট কেনাবেচার জন্য ফরিদপুর সদরের কানাইপুর বাজার প্রসিদ্ধ। ওই বাজারে অন্তত ৩০ বছর ধরে পাটের ব্যবসা করছেন খোকন মাতুব্বর (৪৮)। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে একসময় পাট চাষ করতাম, এখন পাটের ব্যবসা করি। অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি পাট কেনাবেচা যদি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তাহলে কৃষক দাম পাবেন। লাভবান হবেন। আমাদের দেশে আগে সরকার বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের (বিজেএমসি) মাধ্যমে পাট কিনত। সে ক্ষেত্রে পাটের দাম সরকার ঠিক করে দিত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সরকার পাট কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে কৃষক সমস্যায় পড়ে গেছেন।’

পাটের একটি বড় ক্রেতা ফরিদপুরের করিম গ্রুপ। এই গ্রুপের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘কৃষক পাটের ভালো দাম পাক আমরাও চাই। পাটের মণ ছয় হাজার টাকা হলেও আমাদের আপত্তি নেই। তবে বাজারে পাটের দাম স্থিতিশীল হওয়া জরুরি।’

বর্তমানে পাটকাঠি থেকে চারকোল তৈরি করে বিদেশে নিয়ে প্রসাধনী ও কম্পিউটারসামগ্রী তৈরি করা হচ্ছে। এসব কাজ দেশে করা গেলে পাট ও পাঠকাঠির দাম বাড়বে এবং কৃষক উপকৃত হবেন।
হযরত আলী, কৃষি কর্মকর্তা

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হযরত আলী বলেন, পাট উৎপাদনে এ জেলার মাটি উপযোগী, পাশাপাশি পাট উৎপাদনের জন্য পাটের পাতা মাটিতে পড়ে জমি উর্বর হয়। বর্তমানে দেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা বিজেআরআই তোষা পাট-৮ নামে এক জাতের পাট উদ্ভাবন করেছেন। এটি ভারতীয় পাটের চেয়ে উৎকৃষ্ট মানের। পাটগাছ এক থেকে দেড় ফুট বড় হয়। এ পাট চাষ করা গেলে পাটের উৎপাদন আরও বাড়বে, এতে কৃষক আরও লাভবান হবেন।

হযরত আলী আরও বলেন, বর্তমানে পাটকাঠি থেকে চারকোল তৈরি করে বিদেশে নিয়ে প্রসাধনী ও কম্পিউটারসামগ্রী তৈরি করা হচ্ছে। এসব কাজ দেশে করা গেলে পাট ও পাঠকাঠির দাম বাড়বে এবং কৃষক উপকৃত হবেন।