বগুড়ায় বন্যায় ৭৬ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি, দিশেহারা ৪৭ হাজার কৃষক

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া চরের প্রান্তিক কৃষক নুরন্নবী সরকার (৪০) ধারদেনা করে এবার আড়াই বিঘা জমিতে পাট বুনেছিলেন। খেতের পাট বিক্রি করে ছয় মাসের ভাতের চাল ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। সপ্তাহ দু-একের মধ্যে খেতের পাট কেটে জাগ দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু উজানের ঢলে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তলিয়ে গেছে তাঁর খেতের পাট, ভেঙে গেছে তাঁর স্বপ্ন।

খাটিয়ামারি চরের প্রান্তিক কৃষক জাহিদুল ইসলাম। ধারদেনা করে ১০ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। খরচ হয়েছিল ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। স্বপ্ন দেখেছিলেন, পাট বিক্রির টাকায় দায়দেনা শোধ করে ঘরে ছয় মাসের ভাতের চাল কিনবেন। কিন্তু তাঁর ১০ বিঘা খেতের পাট এক মাস ধরে যমুনার পানিতে নিমজ্জিত। পচে গেছে সব খেত।

শুধু নুরুন্নবী বা জাহিদুল নন, খেতের পাট বিক্রি করে ঘরের ভাত জোগানোর এমন স্বপ্ন বন্যা আর নদীভাঙনে ভেঙে গেছে বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার হাজারো কৃষকের। ফসল হারিয়ে এখন তাঁরা দিশেহারা।

কৃষকেরা বলছেন, জুন মাসের শেষ দিকে প্রথম দফা বন্যায় বিস্তীর্ণ চরের হরেক ফসল তলিয়ে যায়। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে কিছুটা পানি কমতে শুরু করলেও কয়েক দিনের মাথায় আরেক দফা খেতের ফসল প্লাবিত হয়। প্রায় এক মাস ধরে খেতের ফসল পানিতে নিমজ্জিত থাকায় এর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। যমুনায় এখনো পানি বিপৎসীমার ওপরে। তাই ফসলের কোনো আশা আর নেই। সব মিলিয়ে কৃষকের কপালে এখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বগুড়া জেলায় ৭৬ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতির প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। এর মধ্যে শুধু সারিয়াকান্দি উপজেলাতেই বন্যায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে ৬৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকার। এর বাইরে সোনাতলা উপজেলায় প্রায় ১০ কোটি টাকার এবং ধুনট উপজেলায় প্রায় ১ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট লোকজনের দেওয়া তথ্যমতে, উজানের ঢলে যমুনায় অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গত এক মাসে দুই দফা বন্যায় ৮ হাজার ৮৩১ হেক্টর ফসল পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। যমুনা ও বাঙ্গালী নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তলিয়ে গেছে ৮ হাজার ৮৩১ হেক্টর জমির রোপা আউশ, পাট, বীজতলা, শাকসবজিসহ নানা জাতের ফসল। বন্যায় ফসল হারিয়ে দিশেহারা ৪৭ হাজার কৃষক পরিবার ।

সারিয়াকান্দি উপজেলার কমরজাপাড়ার কৃষক আবদুর রাজ্জাক (৭৫ ) বলেন, ধারদেনা করে ৮ বিঘা জমি পত্তন নিয়ে পাট চাষ করেছিলেন তিনি। খরচ প্রায় ৫০ হাজার টাকা। ফসল ভালো হওয়ায় আশায় বুক বেঁধেছিলেন, খেতের পাট বিক্রি করে দায়দেনা শোধ দেওয়ার পর সংসারের পাঁচজন মানুষের ছয় মাসের ভাতের চাল কিনে রাখবেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্নের ফসল এখন যমুনার ঢলে নিমজ্জিত। স্বপ্ন ভেঙে খান খান।
গত বৃহস্পতিবার বুকসমান পানিতে নেমে বন্যায় তলিয়ে যাওয়া পাট দেখাচ্ছিলেন বৃদ্ধ আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘ধারদেনার টেকায় জমি আধি লিয়ে আট বিঘা জমিনত পাট লাগাচিলাম। কত স্বপ্ন ছিল এই পাটের খ্যাত লিয়ে। কিন্তু যমুনার বানত সব স্বপ্ন ভাসে গেল। এখন ঘরত ভাত নাই। হাতত টেকা নাই। বানের পানি নেমে গেলেও ফসল আবাদের সামর্থ্য নাই। বউ-ছল লিয়ে না খ্যায়া থাকা লাগবি।’

সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার বন্যাকবলিত চরাঞ্চলের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, পানিতে তলিয়ে আছে বিস্তীর্ণ এলাকার আউশ, পাট ও সবজিখেত। চরাঞ্চলে যমুনার ঢলে ভেসে গেছে শত শত বিঘা জমির জাগ দেওয়া পাট।
হাট করমজাপাড়া চরে গিয়ে দেখা গেল, বিঘার পর বিঘা জমির পাটখেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

উত্তর শিমুলতাইড় গ্রামের কৃষক আমিরুল শেখ বলেন, ‘বিকেলে ৮ বিঘা জমির পাটখেত দেখে এসে রাতে ঘুমিয়েছি। সকালে নদীগর্ভে পাটসহ খেত বিলীন।’
নয়াপাড়া চরের আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যা হামাকেরে সব শ্যাষ করে দিচে। খ্যাতের ফসল ঘরত তোলার স্বপ্ন এখন লন্ডভন্ড।’

শিমুলতাইড় চরের কৃষক আনসার শেখ অথই পানি সাঁতরে খেতের পাট কেটে নৌকায় এনে ঘাটে তুলছিলেন। তিনি বলেন, ‘৪ বিঘা জমিত পাট লাগাইছিলাম। খরচ বিঘায় পাঁচ হাজার টেকা। বানের ঢলত সব পাট ডুবে গেচে। স্রোতের ভিতর ডুব দিয়ে কিছু পাট কাটি নৌকায় ঘাটত আনিচ্চি। আরও ১৫ দিন পর এ পাট লাগত। এ পাটে তেমন আঁশ হবি না। লৌকা ভাড়া আর কাটার দাম দিতেই সব শ্যাষ হবি। খরচের টেকা পুরাটায় লোকসান।’

খাটিয়ামারি চরের কৃষকেরা জানান, সেখানে ৭০০ বিঘা জমির পাট এবং ২০০ বিঘা জমির অন্য ফসল তলিয়ে গেছে।

কৃষকেরা বলছেন, খেতের পাট কাটার কথা আরও কমপক্ষে দুই সপ্তাহ পর। কিন্তু বন্যার কারণে তড়িঘড়ি করে অপরিপক্ব কিছু পাট কেউ কেউ কেটে জাগ দিচ্ছেন। এতে বিঘায় ১০-১২ মণ ফলনের বদলে ৪-৫ মণ পাটের ফলন হচ্ছে।

সারিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুই দফা বন্যায় এ উপজেলায় ৬ হাজার ২৩৭ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৯৬৬ হেক্টর পাট, ২ হাজার ১৩৯ হেক্টর আউশ ধান, ৫৬ হেক্টর শাকসবজি, ৬২ হেক্টর আমনের বীজতলা, ২ হেক্টর মরিচ এবং ১৫ হেক্টর ভুট্টা খেত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নে। এ ইউনিয়নে ৯০ শতাংশ ফসল বন্যার পানিতে নিমজ্জিত।

সারিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল হালিম প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলায় ২৪ হাজার ৫০০ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে এই মুহূর্তে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে নানা জাতের ফসল রয়েছে। যমুনা ও বাঙ্গালী নদীর ঢলে প্রায় এক মাস ধরে নিমজ্জিত রয়েছে ৬ হাজার ২৩৭ হেক্টর জমির ফসল। বন্যায় এখন পর্যন্ত ফসলের ক্ষতি ৬৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সংখ্যা ৩৬ হাজার ৭৮০।

সোনাতলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এ উপজেলায় প্রথম দফা বন্যায় ৯১৩ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫৬ হেক্টরের পাট, ৪০৪ হেক্টরের আউশ, ২৮ হেক্টর বীজতলা এবং ২৫ হেক্টর শাকসবজি রয়েছে। ফসলের ক্ষতি হয়েছে ৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকার। এ ছাড়া দ্বিতীয় দফা বন্যায় আরও ৭৩ হেক্টর জমির ফসল বন্যার পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৮ হাজার ৪১৫ জন।

ধুনট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ মুশিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এ উপজেলায় প্রথম দফা বন্যায় মোট ২৫১ হেক্টর জমি নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে ২২০ হেক্টর পাট, ২০ হেক্টর আউশ ধান, ৫ হেক্টর সবজি, ১ হেক্টর বীজতলা এবং ৫ হেক্টর অন্যান্য ফসল রয়েছে। ক্ষতি হওয়া ফসলের আর্থিক মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। এর বাইরে দ্বিতীয় দফা বন্যাতেও ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ২ হাজারের ওপরে।

জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় প্রতিবছরই জেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ২০১৫ ও ২০১৪ সালের বন্যায় এখানে প্রায় আড়াই শ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছিল। ২০১৭ সালের বন্যায় ফসলের ক্ষতি হয় ১১১ কোটি টাকার। গত বছর বন্যায় ফসলের ক্ষতির পরিমাণ ১২৬ কোটি টাকা।