দল বেঁধে খেত থেকে মরিচ তুলছে একদল শিক্ষার্থী। গত বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁওয়ের সদর উপজেলার রাজাগাঁও এলাকায়
দল বেঁধে খেত থেকে মরিচ তুলছে একদল শিক্ষার্থী। গত বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁওয়ের সদর উপজেলার রাজাগাঁও এলাকায়

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা

বিদ্যালয়ে না গিয়ে মরিচ তোলায় ব্যস্ত শিশুরা

এখন বোরো ধান কাটা-মাড়াইয়ের সময়। তাই মরিচচাষিরা শ্রমিক পাচ্ছেন না। এ সুযোগে খেতে খেতে মরিচ তুলছে শিক্ষার্থীরা।

বেলা একটা। সূর্যের তেজ উপেক্ষা করে মাঠে মরিচ তুলছে একদল শ্রমিক। সেখানে চার শিক্ষার্থীর দেখা মেলে। তাদের একজন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বৈরাগীহাট বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী বাসন্তী রানী। সে বলে, কাজের এ সময়ে তার স্কুলে যাওয়া হয় না। কয়েক দিন পর মরিচ তোলা শেষ হলে আবার স্কুলে যাবে সে।

পাশে থাকা বৈরাগীহাট উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী একাদশ বর্মণ বলে, ‘এখন এক কেজি মরিচ তুলে ১০ টাকা পাওয়া যাচ্ছে। আমরা এক দিনে কম করে হলেও ২৫ কেজি মরিচ তুলতে পারি। দিনে ২৫০ টাকার বেশি আয় হয়। এলাকার অনেক স্কুলের ছাত্রছাত্রী খেত থেকে মরিচ তুলছে। এই সময়ে পড়ার ক্ষতি হলেও পরে সেটা পুষিয়ে নেব।’

ঠাকুরগাঁওয়ে বাড়তি আয়ের আশায় শিশু-কিশোরেরা বিদ্যালয়ে না গিয়ে এখন মরিচ তোলায় ব্যস্ত। ফলে এ সময় সদর উপজেলায় বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার কম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জেলা কার্যালয় সূত্র জানায়, ঠাকুরগাঁওয়ে এবার ৯১৫ হেক্টর জমিতে মরিচ আবাদ হয়েছে। সদর উপজেলার আকচা, ঢোলারহাট, রাজগাঁও, রুহিয়া ও রায়পুরে বেশি মরিচ আবাদ হয়।

উপজেলার চারজন কৃষক বলেন, এখন বোরো ধান কাটা-মাড়াইয়ের সময়। এ সময়ে শ্রমিকদের দম ফেলার ফুরসত নেই। তাই মরিচচাষিরা স্বাভাবিক মজুরিতে শ্রমিকের দেখা পাচ্ছেন না। এ সুযোগে খেতে খেতে মরিচ তুলছে শিক্ষার্থীরা। এই শ্রমের বিনিময়ে যা আয় হচ্ছে, তা সঞ্চয় করে রাখছে তারা।

গত সোমবার সদর উপজেলার ফরিদপুর রাজাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চুয়ামনিডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর বঠিনা কলোনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাজারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমলাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দক্ষিণ আসাননগর নদীরডাঙ্গা তালুকদারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কম। ওই সাত বিদ্যালয়ে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ৩৬৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়েছে মাত্র ১৫০ জন। গড় উপস্থিতির হার ৪০ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এর মধ্যে হাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছিল সবচেয়ে কম উপস্থিতি। সেখানে তিনটি শ্রেণিতে ৪৪ জন শিক্ষার্থী থাকলেও উপস্থিত ছিল মাত্র ৮ জন।

উপজেলার ফাঁড়াবাড়ি এলাকায় দেখা যায়, মা-বাবার সঙ্গে খেত থেকে মরিচ তুলছে শাপলা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শামীম হোসেন ও আলাল হোসেন। তাদের বাবা আবুল হোসেন বলেন, এ সময় শ্রমিকসংকট। খেতের মরিচ তুলতে পারছেন না। কাজটি দ্রুত শেষ করার জন্য দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন।

ফরিদপুর রাজাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিমু আকতার বলে, মা-বাবার কৃষিকাজেই চলে তাদের সংসার। এ সময় এলাকায় শ্রমিকসংকট থাকায় তাঁদের অনুরোধে খেতের মরিচ তুলতে এসেছে সে। এতে মা-বাবার পাশাপাশি তার হতেও কিছু টাকা আসে। আর এই টাকা সে সঞ্চয় করে রাখে।

একই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মৌ রানী ১৪ দিন ধরে বিভিন্ন খেতে মরিচ তুলে দিয়েছে। বিনিময়ে সে ২ হাজার ৬০০ টাকা পেয়েছে। দুই হাজার টাকায় একটি ছাগল কিনে মাকে দিয়েছে।

হাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নার্গিস বেগম বলেন, তাঁদের এলাকা কৃষিনির্ভর। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাই এই সময়ে তাঁরা সন্তানদের মাঠে নিয়ে যান। আবার অনেক শিক্ষার্থী বাড়তি রোজগারের আশায় ভুট্টা ও মরিচ তোলার কাজে যায়। ফলে নানাভাবে বোঝানো হলেও এ সময়ে উপস্থিতির হার কম।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হারুনর রশিদ বলেন, বিদ্যালয় ছেড়ে শিক্ষার্থীদের মাঠে কাজ করার বিষয়টি তাঁরা নিরুৎসাহিত করেন। কারণ, শিক্ষার্থীরা একবার পিছিয়ে পড়লে, সেটি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করতে শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।