দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মধ্যবিত্তদের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। সংসারের ব্যয় কমাতে ভাড়া বাসা ছাড়ছেন অনেকে।
একটি প্রসাধন কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি মো. এনামুল হক (৪০)। ঝালকাঠি শহরের কলেজ সড়কের একটি বাড়ির ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে পাঁচ হাজার টাকায় ভাড়ায় থাকতেন। কিন্তু বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বাড়াতে এখন আর সংসারের ব্যয় কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। ব্যয় কমাতে কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হিসেবে প্রথমেই এসেছে বাসাভাড়া কমানোর সিদ্ধান্ত। বাধ্য হয়ে ফ্ল্যাট বাসা ছেড়ে গত ৩০ মে শহরেরই ছোট একটি টিনশেড বাড়িতে উঠেছেন তিনি। ওই বাড়ির ভাড়া তিন হাজার টাকা। এনামুল হকের ভাষ্য, আপাতত দুই হাজার টাকা তো মাসের খরচের জন্য বাঁচল!
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ঝালকাঠির মতো জেলা শহরগুলোর মধ্যবিত্তদের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। এনামুল হকদের মতো অনেক মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে খরচের লাগাম টানতে পরিবার নিয়ে কম ভাড়ার বাসায় উঠছেন। এ ক্ষেত্রে অনেকে শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে একটু দূরে উপশহরের দিকে চলে যাচ্ছেন। অনেকে তাতেও কুলোতে না পেরে পরিবারকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। শহরের ফ্ল্যাট বাসার মালিকেরা জানিয়েছেন, অনেকে ভাড়াটে বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। খালি ফ্ল্যাটগুলোতে দুই-তিন মাসেও নতুন ভাড়াটে পাওয়া যাচ্ছে না।
মো. এনামুল হক বলেন, ১৮ হাজার টাকা বেতনের মধ্যে ৫ হাজার টাকা বাসাভাড়া দিতে হতো। বাকি ১৩ হাজার টাকায় দুই ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ, সংসারের খরচ চালাতে হতো। এর মধ্যে গ্রামের বাড়ি কাঁঠালিয়ার কচুয়ায় মা-বাবার খরচের জন্যও প্রতি মাসে কিছু পাঠাতে হয়। এতেও টেনেটুনে চালিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম যেই বাড়তে শুরু করল, এই আয় দিয়ে ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে আর চলতে পারছিলেন না। মাসের খরচে দুই-তিন হাজার টাকা ব্যয় বেড়ে গেছে। তাই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে কম ভাড়ার ছোট বাসায় উঠতে বাধ্য হলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ছোট বাসায় মালামাল না ধরায় কিছু আসবাব বিক্রি করে দিয়েছেন।
শহরের আড়তদারপট্টি এলাকার চটের বস্তার ব্যবসায়ী মজিবর মিয়া (৪৫) ছেলেকে ভালো স্কুলে পড়াবেন বলে বছর তিনেক আগে শহরের একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। কিন্তু জিনিসপত্রের চড়া মূল্যের কারণে তিনি টিকতে না পেরে গত এপ্রিল মাসে পরিবার নিয়ে শহরতলির পশ্চিম ঝালকাঠি এলাকায় চলে যান। এখন তিনি প্রতিদিন ইজিবাইকে করে ব্যবসার কাজে শহরে আসছেন।
মজিবর মিয়া বলেন, ‘লাগামহীন খরচ কমাতে বাসাভাড়ার টাকা বাঁচানোর কোনো বিকল্প ছিল না। তাই পরিবার নিয়ে আবার গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেলাম। এখন প্রতিদিন ব্যবসার কাজের জন্য কম টাকার যানবাহনে করে শহরে আসা-যাওয়া করি।’
শহরের অন্তত সাতজন ভাড়াটের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান সময়ে খরচ বাঁচাতে কম ভাড়ার বাসাই তাঁদের পছন্দ। সে ক্ষেত্রে সবাই টিনশেড বাসা বা দুই কক্ষের ফ্ল্যাট বাসা খুঁজে উঠছেন।
শহরের পালবাড়ি এলাকার শুক্কুর মিয়া (৪৮) ১০ বছর ধরে বাসাবাড়ি বদলের জন্য জনবল দিয়ে চুক্তিতে কাজ করেন। এ কাজে তাঁর ২০ জনের দুটি দল রয়েছে। গত দুই মাসের বাসা বদলের কাজ বেশি পাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, গত দুই মাসে তাঁর দলের লোকজন শতাধিক বাসা বদলের কাজ করেছেন। ভাড়াটেদের এখন অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ার ছোট বাসা পছন্দ। অনেককে আবার শহরের ভাড়া বাসা থেকে গ্রামের বাড়িতে মালামাল নিতে সহায়তা করছেন।
শহরের কোর্ট রোড এলাকার বাড়ির মালিক হুমায়ূন কবির বলেন, ‘বেশি ভাড়া দিয়ে পোষাতে না পেরে অনেক ভাড়াটে এখন ফ্ল্যাট বাসা ছেড়ে কম ভাড়ার ছোট বাসায় উঠছেন। দুই মাস পর্যন্ত আমার ছয়টি ফ্ল্যাটের মধ্যে চারটিই খালি পড়ে রয়েছে। নতুন ভাড়াটেও পাচ্ছি না।’
নিম্নমধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো অসহায় হয়ে পড়ছে জানিয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ঝালকাঠি প্রতিবাদী মঞ্চের সভাপতি প্রশান্ত হরি বলেন, মানুষ খুব কষ্টে আছে। সংসারের খরচ কুলাতে পারছেন না অনেকে। অথচ এই মানুষগুলোই কিছুদিন আগেও খেয়েপরে শহরে বাসাভাড়া করে চলতে পারছিলেন। এখন না পেরে আবার অনেকে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। সামনের দিনগুলো নিয়ে আরও শঙ্ো জাগে।