ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় করোনার সম্মুখযুদ্ধে তাঁরা

সাখাওয়াত হোসেন
সাখাওয়াত হোসেন

‘সাড়ে তিন মাসের মধ্যে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে দেখতে চারবার শহরের বাসায় গিয়েছি। যাওয়ার আগে প্রতিবার করোনার জন্য নমুনা পরীক্ষা করেছি। নমুনার ফল নেগেটিভ আসার পরই বাসায় যাই। নমুনার ফল চারবার নেগেটিভ আসার পর চারবার বাসায় যাওয়া হয়েছে। আর প্রথমবার নমুনা সংগ্রহের ২৭ দিন পর সন্তানকে স্পর্শ করেছি।’

এভাবেই কথাগুলো বলেন দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস ধরে ঝুঁকি নিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা সাখাওয়াত হোসেন। নেত্রকোনার কমলাকান্দা উপজেলার বাসিন্দা হলেও স্ত্রীসহ ১১ বছর বয়সী সন্তান ফাইয়াজ সামিন ও ৭ বছর বয়সী সন্তান ফাইয়াজ সাবিতকে নিয়ে জেলা শহরের মৌলভীপাড়ায় থাকেন তিনি।

সাখাওয়াত নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) পদে কর্মরত। ১৯৯৭ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন তিনি। ২০১৩ সালে নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাঁর বদলি হয়। নমুনা সংগ্রহের কাজে আরও আছেন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) আবুল কালাম আজাদ ও সহকারী (ল্যাব) জনি মিয়া। উপজেলায় গত ৩ এপ্রিল থেকে ২১ জুন পর্যন্ত সংগ্রহ করা ৭৬৯টি নমুনার মধ্যে ৭০০ নমুনা একাই সংগ্রহ করেছেন আবুল কালাম। আর সংগ্রহের পর নমুনার নাম্বারিং ও কম্পিউটারে তালিকা করা এবং প্যাকেটে ভরে ঢাকায় পাঠানোর প্রক্রিয়ার কাজটি একা করছেন সাখাওয়াত। এখন পর্যন্ত তাঁদের ২৬টি নমুনা নষ্ট হয়েছে।

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘৭ এপ্রিল নমুনা সংগ্রহের কাজে যোগ দিই। প্রথমবার নমুনা সংগ্রহের ২৭ দিন পর, দ্বিতীয়বার ১৩ দিন পর, তৃতীয়বার ১৭ দিন পর এবং চতুর্থবার ১৫ দিন পর নমুনার ফল নেগেটিভ পেয়ে পরিবারের কাছে গিয়েছি। বাড়ি যাওয়ার সময় গাড়িতে থাকা অন্য ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি থেকেও সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবুও বাড়ি যাই।’

আবুল কালাম আজাদ

সাখাওয়াত বলেন, ‘অধিকাংশ নমুনাই আবুল কালাম আজাদ সংগ্রহ করেছেন। আমিও কিছু নমুনা সংগ্রহ করেছি। তবে সংগ্রহের পর কম্পিউটারে তালিকা করা, নমুনাগুলোর নাম্বারিং থেকে শুরু করে প্যাকেটে ভরে ঢাকার জন্য জেলায় পাঠানোর সমন্বয়ের কাজটি আমি একা করে আসছি। সংগ্রহের পর ৭৬৯টি নমুনার বাকি প্রক্রিয়ার কাজটি আমি একাই করেছি। জনি মিয়া আমাদের কাজে সহযোগিতা করেন। প্রথম দিকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেছি। তবে এখন অনেকেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে নমুনা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বাড়ি বাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়নি। কারণ, নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে থাকা করোনায় সংক্রমিত রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করতে বাড়ি যেতে হয়। আর উপজেলায় প্রথম ৭ এপ্রিল করোনায় মালেশিয়াপ্রবাসী শাহ আলম (৩৭) মারা যান। এরপর তিন দফায় শাহ আলমের বাড়ি ও দুই দফায় তাঁর শ্বশুরবাড়িতে স্বজনদের নমুনা সংগ্রহের জন্য যেতে হয়েছে। শাহ আলমের স্ত্রী, আড়াই বছরের সন্তানসহ ছয়জন করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় নমুনা সংগ্রহের জন্য উপজেলায় করোনায় সংক্রমিত সবার বাড়িতে দুজন মিলে গিয়েছি।’

সাখাওয়াত আরও বলেন, ‘নমুনা সংগ্রহের জন্য মৃতসহ প্রবাসীদের বাড়ি, এমনকি উপজেলা হাঁস–মুরগি প্রজননকেন্দ্রের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনেও যেতে হয়েছে। নিরাপত্তাসরঞ্জাম পরা থাকলেও নমুনা সংগ্রহের সময় রোগীদের মাথা ও ঘাড়ে ধরতে হয়। যেদিন শুনি সংক্রমিত ওই ব্যক্তিটির নমুনা আমরা সংগ্রহ করেছি, ওই দিন রাতে ভয় লাগে। তখন নানা বিষয় মাথায় খেলা করে। তখন ভাবি, ওই ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহের সময় আমি কেমনভাবে ছিলাম। সে সময় আমার নিরাপত্তা ছিল কি না। মাস্ক, গ্লাভস, জুতার কাভার, চশমা এসব পরে ছিলাম কি না। আর পরিবার, আত্মীয়স্বজনসহ যখন সবাই বলে সাবধানে থাকো, তখন ভয় আরও বেশি লাগে। রাতে যখন একা থাকি, একটু ভয় কাজ করে। নিজের জন্য নয়, স্ত্রী-সন্তাদের জন্য ভয় বেশি লাগে। আমার কিছু হয়ে গেলে তাদের কী হবে। মানসিকভাবে আমি অনেক শক্ত। আর কাজটি আমাদেরই করতে হবে।’

আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘৩ এপ্রিল থেকে নমুনা সংগ্রহ করি। আমি একাই ৭০০ নমুনা সংগ্রহ করেছি। যখন যেখানে যাওয়া দরকার বা প্রয়োজন, সেখানেই নমুনা সংগ্রহের কাজে যাচ্ছি। এক দিনের প্রশিক্ষণেই নমুনা সংগ্রহের কাজ করছি।’

আবুল কালাম ২০১৯ সালে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে সংযুক্তিতে নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগ দেন। সরাইল ও নাসিরনগর উভয় জায়গায় কাজ করতেন তিনি। করোনার জন্য বর্তমানে তিনি নাসিরনগরে থেকেই নমুনা সংগ্রহ করছেন।

আবুল কালাম বলেন, ‘সারা দেশে নমুনা সংগ্রহের জন্য মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের (ল্যাব) ঘাটতি রয়েছে। আর এই পেশাই ঝুঁকির পেশা। ভয় পেলে চলবে না। আর ভয় পেলেও কাজটি করতে হবে। বাসায় স্ত্রী-সন্তান আছে। তবে বাড়িতে আমি আলাদা কক্ষে একা থাকি। তাঁদের কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি।’