
লাঠিতে ভর দিয়ে একাই হেঁটে নিজ বাসভবনের অভ্যর্থনাকক্ষে এলেন। স্মিত হেসে কুশল জিজ্ঞেস করলেন। ৮৬ বছর ছুঁই ছুঁই ভাষাসংগ্রামী মো. আবদুল আজিজের কণ্ঠে বায়ান্নর তেজ যেন এখনো অটুট। কানে একটু কম শোনেন। কিন্তু স্মৃতি সজীব। প্রথম আলোর কাছে ৭০ বছর আগের সেই স্মৃতিই রোমন্থন করলেন গত শনিবার রাতে।
সিলেট নগরের কুমারপাড়া এলাকায় একটি বাসায় ভাষাসংগ্রামী, লেখক ও মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য মো. আবদুল আজিজ স্ত্রী-কন্যা নিয়ে বসবাস করেন। বাসার বাইরে খুব একটা বের হন না। সিলেট শহরের পাশে অবস্থিত মফস্বলের একটি এলাকা তাজপুর (ওসমানীনগর উপজেলায় অবস্থিত) এবং সেখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কেমন করে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল, সে কথাও আলাপচারিতায় জানা গেল। বেশ কিছু গবেষণা ও আত্মস্মৃতিমূলক বইয়ের পাশাপাশি মো. আবদুল আজিজ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সিলেট নামে একটি বইও রচনা করেছেন। সাহিত্য সমালোচকদের অভিমত, এটি সিলেটের ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক একটি দালিলিক আকর গ্রন্থ।
আবদুল আজিজ বলেন, ‘আমি তখন মঙ্গলচণ্ডী হাইস্কুল থেকে দশম শ্রেণির টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তখনই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন দানা বাঁধে। যেহেতু আমি ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম, তাই সিলেট শহরের অনেক নেতার সঙ্গে আমার ভালো যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক ছিল। অনেকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও ছিল। তাঁরাই আমাকে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য জানাতেন। সিলেটের নেতারাই আমাকে স্থানীয়ভাবে তাজপুরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট পালনের নির্দেশনা দেন।’
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে তাজপুর এলাকার মঙ্গলচণ্ডী হাইস্কুলে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেন আবদুল আজিজ। এ কাজে তাঁকে পরামর্শ দেন রাজনীতিবিদ আবদুল বারি। সেদিন ছাত্রদের উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধর্মঘটও পালিত হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ছাত্রনেতা আসাদ্দর আলীর মাধ্যমে ঢাকায় রাষ্ট্রভাষার দাবিতে মিছিলরত ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা তিনি জানতে পারেন। পরদিন বিদ্যালয় খোলার আগেই তাঁরা একটি ছাত্রসভার আয়োজন করেন ও এই সভা তিনিই পরিচালনা করেন।
আবদুল আজিজ বলেন, ‘পুলিশের গ্রেপ্তার এড়াতে সিলেট শহরে চলে এসেছিলাম। কয়েক দিন এভাবে চলার পর নেতৃত্ব শূন্যতায় আমাদের স্কুলকেন্দ্রিক ধর্মঘট আপনাআপনিই থেমে যায়। তবে তাজপুরের মতো একটি মফস্বল এলাকায়ও ভাষা আন্দোলনের ঢেউ আমরা ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল।’