
করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে সরকারের ঘোষিত সাধারণ ছুটিতে দিনমজুর ও শ্রমজীবীসহ সমাজের দরিদ্র শ্রেণির মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। এসব মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে এলাকার বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষ একটি ঘরে সাধ্যমতো খাদ্যসামগ্রী রেখে যাচ্ছেন। সেখান থেকে অসহায় মানুষেরা খাবার নিয়ে যাচ্ছেন।
সচ্ছল ও অসচ্ছল মানুষের মেলবন্ধনের অনন্য এই উদ্যোগের নাম ‘মানবতার ঘর’। এখানে দরিদ্র মানুষকে সহায়তার জন্য কেউ খাদ্যসামগ্রী রেখে যেতে পারেন। আর প্রয়োজন হলে দরিদ্র-অসহায় মানুষেরা এখান থেকে খাবার নিয়ে যেতে পারেন। নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নে শুরু করা হয়েছে এমন ‘মানবতার ঘর’।
গতকাল রোববার বিকেলে এনায়েতপুর ইউনিয়নের কালুশহর এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের পাশে একটি ছোট্ট ঘরের ওপর চোখ পড়ল। ঘরটির বাইরের দেয়ালে লেখা রয়েছে ‘মানবতার ঘর’। ব্যানারে লেখা রয়েছে, ‘সচ্ছল-অসচ্ছল মানুষের মেলবন্ধন’; ‘প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের করোনা ভাইরাসের কারণে কর্মহীন, দুস্থ ও অসহায় মানুষের কল্যাণার্থে এই ক্ষুদ্র প্রয়াস’। আরও লেখা রয়েছে ‘অতিরিক্ত খাবার রেখে যান, প্রয়োজনীয় খাবার নিয়ে যান।’
ব্যানার দেখে কৌতূহল নিয়ে ঘরের ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, চারপাশে দেয়াল ঘেঁষে বিভিন্ন তাক ও বেঞ্চের ওপর সাজিয়ে রাখা হয়েছে খাদ্যসামগ্রীর ব্যাগ। কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে দেখা গেল, এক নারী খাবারের একটি ব্যাগ নিয়ে গেলেন। পরে আরও কয়েকজন ওই ঘর থেকে খাদ্যসামগ্রীর ব্যাগ নিয়ে গেলেন।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে ওই সময় ঘরটির তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা আনিসুর রহমান নামে এক যুবক জানালেন, খাদ্য সহায়তা নিয়ে কারও বাড়িতে নয়, খাদ্য সামগ্রী রাখা থাকবে এই ঘরে। এখানে রাখা খাদ্য সামগ্রী নিয়ে যেতে পারবেন যেকোনো হতদরিদ্র মানুষ। এই উদ্যোগটি নিয়েছেন মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজানুর রহমান। তাঁর পরিকল্পনা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এনায়েতপুর ইউনিয়ন পরিষদ এই ‘মানবতার ঘর’ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। গত শুক্রবার থেকে মানবতার ঘর চালু হয়েছে। এলাকায় মাইকিং করে এই ঘরে বিত্তবান মানুষদের খাদ্যসামগ্রী রেখে যাওয়া এবং হতদরিদ্র মানুষদের এখান থেকে খাবার নিয়ে যেতে আহ্বান করা হচ্ছে। চালুর পর থেকে এই কার্যক্রম এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
আনিসুরের সঙ্গে কথা বলার সময়ই ওই ঘরের সামনে একটি ভ্যান এসে দাঁড়াল। অসহায় মানুষকে সহায়তার জন্য স্থানীয় এক ব্যক্তি ৫০ ব্যাগ খাদ্যসামগ্রী এই ঘরে রাখতে এসেছেন। আমিনুল ইসলাম নামের ওই ব্যক্তি বলেন, ‘এলাকায় রিকশা-ভ্যান চালায় এবং দিনমজুরের কাজ করে এমন অনেক মানুষ চলমান পরিস্থিতিতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তাঁরা পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। নিজের গ্রামের কয়েকজনকে আমি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছি। মানবতার ঘরের কথা শোনার পর সাধ্যমতো এখানেও কিছু ব্যাগ নিয়ে এসেছি। এই উদ্যোগটি খুব ভালো। অনেক অসহায় মানুষ রয়েছেন যাঁরা খাবার চাইতে পারেন না। অনেকের অসহায়ত্বের কথা বাইরে থেকে বোঝা যায় না, ওই সব মানুষ এখান থেকে খাবার নিয়ে গিয়ে উপকৃত হবেন। সমাজের বিত্তবান মানুষদের এই ঘরে বেশি বেশি করে দান করা উচিত।’
এনায়েতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান বলেন, ‘ইউএনও স্যার সম্প্রতি উপজেলার সকল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের ডেকে সরকারি ত্রাণ সহায়তা সুষ্ঠুভাবে বিতরণের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষকে ত্রাণ সহায়তায় যুক্ত করার জন্য প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ‘মানবতার ঘর’ করার জন্য আহ্বান জানান। তাঁর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় ইউপি সদস্য এবং এলাকার উদ্যমী কিছু তরুণের সহায়তা নিয়ে এই ঘর আমরা চালু করেছি। এটা খুবই সাড়া ফেলেছে। বিত্তবান মানুষদের দানে এই ঘর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার ব্যাগ খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সরকারি বরাদ্দে উপজেলায় প্রায় ৬ হাজার হতদরিদ্র ও কর্মহীন পরিবারের মাঝে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কর্মঝুঁকিতে পড়া আরও অনেক অসহায় মানুষ রয়েছেন যাঁদের কাছে সরকারি খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের একার পক্ষে এত বড় মানবিক সহায়তা পরিচালনা করা খুবই দুষ্কর। তাই এই কাজে সমাজের বিত্তবান মানুষদের সম্পৃক্ত করার জন্য এই “মানবতার ঘর” এর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তায় কালুশহর এলাকায় একটি মানবতার ঘর চালু হয়েছে। অন্য আরও নয়টি ইউনিয়ন পরিষদে এই মানবতার ঘর তৈরির উদ্যোগ চলছে।’