
‘মা রে মা, তুই কি আমারে মাফ করবি? আমি তোরে বুকে ধইরা রাখতে পারলাম না। মাঝরাস্তায় তোর ছোট্ট শইলডা রক্তে ভাইসা গেল!’
মৃত মেয়ের জামায় চুমু খেতে খেতে বলছিলেন সুজন বর্ধন। তাঁর কণ্ঠে তখন প্রচণ্ড হাহাকার ও যন্ত্রণা। সুজনের বিলাপ ছুঁয়ে যাচ্ছিল ওই বাড়িতে সান্ত্বনা দিতে আসা প্রতিবেশীদেরও। তাঁদের চোখও আর্দ্র হয়ে উঠছিল।
এ সময় স্বজনেরা সুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে বারবার অনুরোধ করেন, ‘একটু কান (কান্না কর), বাবা। চোখের পানির লগে কষ্টটা বাইর হইয়া যাইব।’ সুজন কান্না করতে পারেন না। আর্তনাদ করে বারবার শুধু বলেন, ‘ইশ্! কী হইল রে মা। ঘরে থাকলে তোরে তো আমি বুকে আগলাইয়া রাখি। রাস্তায় তো দেইখা রাখার কেউ নাই। এর লাইগাই তোরে যাইতে না করছিলাম।’
আজ শুক্রবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার মনোহরদী গ্রামে সুজন বর্ধনের বাড়িতে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়।
এর আগে আজ সকালে মোটরসাইকেলে করে সোনারগাঁয়ে যাওয়ার পথে সুজনের একমাত্র মেয়ে ইচ্ছে বর্ধন (৭) ও সুজনের বড় ভাই সুমন বর্ধনের মেয়ে মিষ্টি বর্ধন (৫) কাভার্ড ভ্যানচাপায় প্রাণ হারায়। গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন সুমন বর্ধন ও তাঁর বাবা কার্তিক বর্ধন। তাঁদের দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
সুজনের পাশের কক্ষেই কাঁদতে কাঁদতে মূর্ছা যাচ্ছিলেন তাঁর স্ত্রী নদী রানী বর্ধন। সৃষ্টিকর্তাকে প্রশ্ন করছিলেন, কোন অপরাধে তাঁদের মেয়েকে সড়কে জীবন দিতে হলো?
পাশের ঘরে নিহত মিষ্টি বর্ধনের মা সবিতা বর্ধন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন। একদিকে মেয়ের মৃত্যু, অন্যদিকে স্বামী ও শ্বশুর মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। একই পরিবারের এত মানুষের হতাহত হওয়ার ঘটনায় সবিতাকে সান্ত্বনা দিতে আসা স্বজনদের কণ্ঠও ভারী হয়ে উঠছিল।
সুজনের ভাই নেপাল বর্ধন প্রথম আলোকে বলেন, সকালে মিষ্টি, ইচ্ছে, কার্তিক ও সুমন একই মোটরসাইকেলে করে মনোহরদী গ্রাম থেকে সোনারগাঁয়ের শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রমে যাচ্ছিলেন। সকাল নয়টায় তাঁরা নরসিংদী-মদনগঞ্জ সড়কের লেঙ্গুরদী এ এম বদরুজ্জামান উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে পৌঁছালে পেছন থেকে আসা একটি কাভার্ড ভ্যান তাঁদের মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়। এতে সড়কে ছিটকে পড়ে ঘটনাস্থলেই ইচ্ছে বর্ধনের মৃত্যু হয়। পরে স্থানীয় লোকজন সুমন, কার্তিক ও মিষ্টিকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানকার জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মিষ্টিকে মৃত ঘোষণা করেন। বাকি দুজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁদের দুজনের মাথায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।
আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিচুর রহমান প্রথম বলেন, নিহত দুই শিশুর লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ওই কাভার্ড ভ্যানচালককে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।