রিফাতের চোখে জল নেই, আছে অসীম বেদনা

বাবা, দাদা–দাদি সবাই আছে, শুধু নেই মা। তাই মাকে ছাড়া ঈদের আনন্দ নেই রিফাত ও আজমিরির। শুক্রবার দুপুরে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার বালিগ্রামে রিফাতদের বাড়িতে
ছবি: প্রথম আলো

মা নেই। কখনো আর ফিরে আসবেন না। ‘বাজান’ ‘বাজান’ বলে বুকে আর টেনে নেবেন না। এটুকু বোঝার বয়স হয়েছে রিফাতের। তাই রিফাতের চোখে জল নেই। আছে মাকে হারানোর অসীম বেদনা। বুকের মধ্যে লুকানো কষ্ট। আজ ঈদের খুশি ছেয়ে গেছে বিষাদে।

১২ বছর বয়সী রিফাতের ৭ বছর বয়সী ছোট্ট এক বোন আছে। নাম তার আজমিরি। ঈদের দিনটি তার কাছে খুব আনন্দের। সে এখনো অপেক্ষায় আছে তার মা ফিরে আসবেন, কোলে তুলে নেবেন। নতুন জামা পরিয়ে ঘুরতে নিয়ে যাবেন। কিন্তু অবুঝ শিশুটি জানে না, তার মা আর কোনো দিনই আসবেন না।

পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার জন্য কেনাকাটা শেষে গত বুধবার নারায়ণগঞ্জ থেকে ছেলে রিফাতকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার বালিগ্রামের শ্রমজীবী আল-আমিন ব্যাপারীর স্ত্রী পোশাকশ্রমিক নিপা আক্তার (৪৫)। ফেরিতে শিমুলিয়া থেকে বাংলাবাজার আসার পথে মানুষের চাপে পদদলিত হয়ে মারা যান নিপাসহ পাঁচজন। এ ঘটনায় নিপার ছেলে রিফাত প্রাণে বেঁচে যায়। চোখের সামনে মায়ের এমন করুণ মৃত্যুর ঘটনা কিছুতেই ভুলতে পারছে না রিফাত। বিভীষিকাময় মুহূর্তটা মনে করতেই কেঁদে ওঠে সে।

মাকে ছাড়া প্রথম ঈদ কাটছে আজমিরি ও রিফাতের। আজ শুক্রবার ঈদের দুপুরে বালিগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, দাদা আর দাদির কাছে রিফাত আর আজমিরি। তাদের বাবা আল-আমিন ব্যাপারীও আছেন। ঈদের আনন্দ নেই রিফাতদের বাড়িতে। বাক্‌রুদ্ধ সবাই। আশপাশে শোকাবহ পরিবেশ। আনন্দ নেই প্রতিবেশীদের মধ্যেও। সবার চোখেমুখেই বেদনার ছাপ।

ঈদের দিন কেমন কাটছে, জিজ্ঞাসা করতেই মুষড়ে পড়া রিফাত বলে উঠল, ‘আমার মায় পানি খাইতে চাইল। আমি ফেরিতে ভিড় ঠেইলা এক বোতল পানি নিয়া আসি, মারে পানি খাওয়াই। মায় তখন বলে, ফেরির ডেকে একটু শুইবে। তখন আমি পাশের দুজন মানুষকে পানি খাওয়াতে যাই। পরে ফেরিডা যখন ঘাটে ভিড়াইল, তখনই সবাই হুড়াহুড়ি শুরু করে দিল। ভিড়ের ঠেলায় ফেরিতে মায়রে আমি হারাইয়া ফালাই। আমার মারে আমি খুঁজতে থাহি। পরে দেহি, ফেরিতে ডেকে মায় পইড়া রইছে। আমার চোহের (চোখের) সামনে মা মাইরা গেল। আমার মারে বাঁচাইতে পারলাম না আমি...।’

রিফাতের বাবা আল-আমিন করাতকলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। মা নিপা আক্তার পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। কর্মসূত্রে তাঁরা নারায়ণগঞ্জে থাকতেন। ছেলে রিফাত বাবা–মায়ের সঙ্গে থাকলেও মেয়ে আজমিরি থাকে দাদার বাড়িতে। সেখানে থেকেই স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে লেখাপড়া করে আজমিরি।

আর রিফাত নারায়ণগঞ্জ শহরের একটি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ালেখা করে। বাবা সংসার খরচ চালালেও মায়ের উপার্জিত টাকায় চলত রিফাত ও আজমিরির পড়ালেখা।

রিফাতের বাবা আল-আমিন বলেন, স্ত্রীকে নিয়ে প্রতিবছর ঈদের আগে তিনি বাড়িতে আসেন। এ বছর স্ত্রী ও ছেলেকে একসঙ্গে বাড়িতে পাঠান। পথে যে এমন হবে, তা জানলে আর বাড়িতে পাঠাতেন না। স্ত্রীর মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি সেদিন রাতেই বাড়িতে আসেন। ছেলেটা ওর মা নেই, সেটা বোঝে, কিন্তু মেয়েটা খালি মা মা করে ডাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওরা প্রথম ওদের মাকে ছাড়া ঈদ করছে। একটু পরপর মেয়েটা খালি কান্না করছে। আবার চুপ করে ঘরের মধ্যেই বসে আছে। আমি বাবা হয়েও ওদের মায়ের সুখ কী করে এনে দেব?’

আক্ষেপ করে রিফাতের দাদা এসকেন ব্যাপারী বলেন, ‘আমাগো ঈদ আর ঈদ নাই। সব মাটি হয়ে গেছে। নাতি-নাতনির চোখের দিকে তাকাতে কষ্ট হচ্ছে। ওরা এত কম বয়সে মা হারানোর শোক ভুলতে পারছে না। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ওদের। ওদের কষ্টে আমাদেরও চোখে পানি চলে আসে।’