শেষবারের মতো নিরুদ্দেশ যাত্রা কিশোর দুটির

মানিক, বিজয়
মানিক, বিজয়

অভাবের জীবন। আর সব শিশু–কিশোরের মতো যে  স্কুলে যাবে, সে সুযোগও নেই। পেট চালাতে এটা সেটা কাজ করে এ দোকান, সে দোকানে। কোথাও আনন্দের কিছু ছিল না ওদের জীবনে। তাই হয়ত একটু রোমাঞ্চের খোঁজে বাড়ি থেকে প্রায়ই পালিয়ে যেত দুই কিশোর। গত শুক্রবারও তারা বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়। এর দুই দিন পরই গত রোববার সকালে ঢাকার টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশনের পাশে পাওয়া যায় কিশোরের দুটির লাশ। তাদের একজনের পকেটে রাজশাহীর একটি দোকানের ভিজিটিং কার্ড ছিল। এই কার্ডে পাওয়া ফোন নম্বরের সূত্র ধরে পুলিশ নিশ্চিত হয় শিশু দুটির পরিচয়।

এই দুই কিশোরের নাম হচ্ছে মানিক (১৪) ও বিজয় (১৩)। মানিক রাজশাহী নগরের মেহেরচণ্ডী এলাকার আনফর রহমানের ছেলে। আর বিজয় পাশের জামালপুর এলাকার মো. রুহুলের ছেলে।

গত রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজে লাশ নিতে আসা কিশোর দুটির পরিবারের লোকজনের সঙ্গে ছিলেন রাজশাহী নগরের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আক্তারুজ্জামান।    তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ওরা শুক্রবার বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। রোববার সকালে টঙ্গী থানা–পুলিশ রেলওয়ে স্টেশনের পাশ থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করে। তাদের মধ্যে মানিকের পকেটে রাজশাহী নগরের মুনলাইট নামের একটি দোকানের ভিজিটিং কার্ড ছিল। কার্ডের নম্বর দেখে পুলিশ ওই দোকানে ফোন করলে তাঁরা ছবি চেয়ে পাঠান। পুলিশ নিহত কিশোর দুটির ছবি পাঠায়। ছবি দেখে দোকানের লোকজন এক কিশোরকে তাঁদের দোকানের সাবেক কর্মচারী বলে শনাক্ত করেন। পরে তাদের বাড়িতে খবর দেওয়া হয়। গত রোববার রাতে লাশ দুটি রাজশাহীতে এনে দাফন করা হয়।

কিশোর দুটির একজনের মাথা ও মুখমণ্ডলে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। আরেকজন শরীরে মারাত্মক আঘাত পেয়েছে। রাজশাহী নগরের চন্দ্রিমা থানার ওসি হুমায়ূন কবির জানান, ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কায় কিশোর দুটির মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

মেহেরচণ্ডী মহল্লার মুদিদোকানি ওয়াহিদুর রহমান সম্পর্কে মানিকের দাদা। তিনি মানিকের লাশ নিতে ঢাকায় গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, মানিক তার মা–বাবার একমাত্র সন্তান। মানিকের জন্মের পরপরই তার বাবা মারা যান। মা মুরশিদা খাতুন (৩০) বাসাবাড়িতে কাজ করেন। মানিক তৃতীয় কি চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পরে একটি দোকানে কাজ নেয়। সবশেষে সে রাজশাহী নগরের মুনলাইট নামের একটি ওষুধের দোকানে কাজ করত। এটাই তিনি জানতেন। হঠাৎ গত শুক্রবার রাতে মানিকের মা ছেলেকে খুঁজতে তাঁর দোকানে আসেন। মানিক যাওয়ার সময় বাড়িতে কিছু বলে যায়নি। ওয়াহিদুর বলেন, তিনি মানিকের মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন। তাঁর ধারণা ছিল, মানিক হয়তো কোনো আত্মীয়ের বাসায় গেছে, সকালে আসবে। তারপর কোনো খবর নেই। এরপর রোববার মুনলাইট ওষুধের দোকান থেকে ফোন আসে। তারা সেখানে গিয়ে ছবি দেখে চিনতে পারেন। রেলওয়ে পুলিশ ওই দোকানে ছবি পাঠিয়েছিল। তাঁরা ঢাকায় যাওয়ার পরে ওই পুলিশ সদস্য তাঁদের বলেছেন, তাঁদের ধারণা, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ওয়াহিদুর বলেন, একজন ডোম অটোরিকশায় করে লাশ দুটি তুলে আনেন। যাওয়ার সময় বাড়ি থেকে কোনো টাকাও নিয়ে যায়নি মানিক। ওর কাছে কোনো পয়সাও ছিল না। পুলিশও তাদের কাছে কোনো টাকাপয়সা পায়নি। আর বিজয় ছেলেটা তো আরও গরিব।

বিজয়ের প্রতিবেশী তসলিম উদ্দিন নগরের একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। তিনি বলেন, বিজয়রা দুই ভাই, দুই বোন। ভাইবোনের মধ্যে বিজয় তৃতীয়। ওর মা তুসলি খাতুন বাসাবাড়িতে কাজ করেন। ওর বাবাও অন্যের জমিতে কাজ করতেন। বাবা মারা গেছেন। গরিব মানুষ। তাই বাচ্চাটা পড়াশোনা করার সুযোগ পায়নি। দোকানে দোকানে কাজ করত। সবশেষে বিজয়নগর বাইপাস সড়কের পাশে একটি ওয়ার্কশপে কাজ করত।

দুই কিশোরের বাড়িতে গিয়েছিলেন চন্দ্রিমা থানার এসআই আবদুল করিম। তিনি বলেন, ওরা কাউকে কিছু না বলে প্রায়ই বাড়ি থেকে পালিয়ে যেত। গত শুক্রবার বিকেলেও বাড়ি ছেড়ে পালায় শিশু দুটি। পরে মুনলাইট থেকে তাদের খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে তারা ঢাকায় লাশ নিতে যায়।