সিলেট কালেক্টরস শোতে আসা দর্শনার্থীরা। আজ শনিবার সিলেট নগরের দরগাগেট এলাকায় কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে
সিলেট কালেক্টরস শোতে আসা দর্শনার্থীরা। আজ শনিবার সিলেট নগরের দরগাগেট এলাকায় কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে

সিলেটে দুর্লভ ও পুরোনো জিনিস-দলিলপত্রের প্রদর্শনী

সম্রাট আওরঙ্গজেবের হাতে লেখা পবিত্র কোরআন শরিফ, হাজার বছরের পুরোনো গাছের জীবাশ্ম, ১৮৮১ সালের পুরোনো দলিল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও মোগল আমলের দলিলপত্র, শতবর্ষী চিঠি ও কাবিননামা, তুলট কাগজে লেখা পুঁথি, গ্রামোফোনসহ অসংখ্য সংগ্রহ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীরা দেখছেন আর ছবি তুলছেন।

এ দৃশ্য দেখা গেছে সিলেট নগরের দরগাগেট এলাকার কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের (কেমুসাস) সাহিত্য আসরকক্ষে। এখানে শনিবার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সিলেট কালেক্টরস শো’। সিলেটে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দিনভর ভিড় জমিয়েছিলেন। সিলেট কালেক্টরস সোসাইটি আয়োজিত এ প্রদর্শনী সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে।

প্রদর্শনীতে ডাক বিভাগ থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন খাম ও ডাকটিকিট, গ্রামোফোন রেকর্ড, রাজা জ্ঞানদাকণ্ঠ রায় বাহাদুরের ১৮৮১ সালে সম্পাদন করা দলিল, কলকাতার বটতলা থেকে প্রকাশিত শতবর্ষী পুঁথি, স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত প্রথম বই, পঞ্চাশের দশকের মাটির থালা, ১৮৭০ সালের চুন রাখার পাত্র, ১৯৩৫ সালের লবণদানি, শতবর্ষী সুরমাদানি, ১৮৭৪ সালে সম্পাদিত ১ টাকার কাবিননামা, বহু পুরোনো ঘড়ি, সম্রাট আকবরের সময়কার মুদ্রা, ১৯৭৩ সালের পর থেকে বাংলাদেশে প্রচলিত মুদ্রা এবং ১৮৭০ সালে চা-বাগানে টোকেন হিসেবে ব্যবহৃত মুদ্রাসহ নানা ধরনের সামগ্রী ঠাঁই পেয়েছে।

শনিবার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সিলেট কালেক্টরস শো’। সিলেটে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দিনভর ভিড় জমিয়েছিলেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রচুরসংখ্যক মানুষ প্রদর্শনী ঘুরে দেখছেন। দুর্লভ ও পুরোনো জিনিস এবং দলিলাদির ছবিও তুলছেন কেউ কেউ। অনেকে প্রদর্শনীতে মুঠোফোনে সেলফিও তুলছেন। কাউকে কাউকে সংগ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে নোট খাতায় দুর্লভ উপকরণের বিষয়াদি লিখতেও দেখা যায়। সংগ্রাহক ইসমত হানিফা চৌধুরী, সৈয়দ মান্নান বকস ও আবু শামীম মোহাম্মদ তালহা জানান, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নানা ঐতিহ্যিক জিনিসপত্র ও উপকরণ সংগ্রহ করেছেন। এসবই তাঁরা প্রদর্শনীতে রেখেছেন।

সিলেট কালেক্টরস সোসাইটি আয়োজিত এ প্রদর্শনী সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে। আজ শনিবার সিলেট নগরের দরগাগেট এলাকায় কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে

প্রদর্শনীতে কেমুসাসের সহসভাপতি দেওয়ান মাহমুদ রাজা চৌধুরী তাঁদের পরিবারের বংশপরম্পরায় সংগ্রহ করা আড়াই শ বছরের পুরোনো ঘড়ি, সোয়া শ বছরের পুরোনো দুটো হুক্কা এবং দেড় শ বছরের পুরোনো কলের গান দর্শনার্থীদের দেখার জন্য উপস্থাপন করেছেন। দেওয়ান মাহমুদ রাজা চৌধুরী বলেন, তাঁরা সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া জমিদার পরিবারের উত্তরসূরি। পূর্বসূরিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন ঐতিহ্যিক জিনিসপত্র তাঁরা যত্নের সঙ্গে এখনো সংরক্ষণ করে রেখেছেন। বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে এসব জিনিসের পরিচয় করিয়ে দিতেই প্রদর্শনীতে এসব রেখেছেন বলে জানিয়েছেন। এমনকি কলের গান কীভাবে বাজে, সেসবও অনেককে বাজিয়ে শোনান।

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিশির কুমার নাথ। তিনি জানান, প্রদর্শনীতে তাঁর সংগৃহীত মহান মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রকাশিত পোস্টার, বহু পুরোনো বইপত্র ও তালপাতার পুঁথি, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও ঐতিহাসিক সাত মার্চের রেকর্ড, পূর্ব পাকিস্তান যুদ্ধ তহবিল কুপন, শতবর্ষী চিঠি, জমিদার শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র গোস্বামীর খাজনা আদায়ের রসিদসহ বহু দুর্লভ জিনিসপত্র রেখেছেন।

দিনব্যাপী প্রদর্শনীতে ১০ জন শৌখিন সংগ্রাহকের অন্তত ২ হাজার সংগ্রহ দর্শনার্থীদের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে

বেলা ১১টায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট গবেষক আবদুল হামিদ মানিক। আয়োজক সংগঠনের সভাপতি মোস্তাফা শাহজামান চৌধুরী বাহারের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক কামাল আহমদ চৌধুরী। অন্যান্যের মধ্যে কেমুসাসের সহসভাপতি দেওয়ান মাহমুদ রাজা চৌধুরী, লেখক সেলিম আউয়াল, সৈয়দ মবনু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

আয়োজকেরা জানিয়েছেন, ২০২০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সিলেট কালেক্টরস সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে সংগঠনটিতে ১২ জন সদস্য রয়েছেন। দিনব্যাপী প্রদর্শনীতে ১০ জন শৌখিন সংগ্রাহকের অন্তত ২ হাজার সংগ্রহ দর্শনার্থীদের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। ৫০০ থেকে ৬০০ দর্শনার্থী প্রদর্শনীতে উপস্থিত হয়েছিলেন। অনেক শিক্ষার্থীও অভিভাবকদের সঙ্গে এসেছিল। সবাই ঘুরে ঘুরে প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত জিনিসপত্র দেখেছেন।

প্রদর্শনীতে আসা সুমাইয়া বেগম (৪৯) নামের এক গৃহিণী বলেন, ফেসবুকে প্রদর্শনীর প্রচারণা দেখে স্কুলপড়ুয়া মেয়ে ও ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। পুরোনো অনেক জিনিস ও দলিলপত্রের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে পেরে ভালো লাগছে। মো. মামুনুল হক নামের এক মাদ্রাসাশিক্ষার্থী বলে, সম্রাট আওরঙ্গজেবের হাতে লেখা পবিত্র কোরআন শরিফ দেখে তার খুবই ভালো লেগেছে। এ ছাড়া প্রদর্শনীতে হাতে লেখা ক্ষুদ্র আকারের পবিত্র কোরআন শরিফও সে দেখেছে বলে জানায়।

সিলেট কালেক্টরস সোসাইটির সভাপতি মোস্তাফা শাহজামান চৌধুরী বাহার প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেকের সংগ্রহে নানা দুর্লভ জিনিস ও উপকরণ রয়েছে। অন্যকে এসব দেখিয়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্যপ্রেমী করার উদ্দেশ্যেই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও ধারাবাহিকভাবে এমনটা করা হবে। কারণ, এসব প্রদর্শনীতে এসে মানুষের জ্ঞান ও শিক্ষার বিকাশ ঘটবে বলে আমরা মনে করি।’