নরসিংদী শহরের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের বিনা মূল্যে করোনার টিকার নিবন্ধন করে দিচ্ছে ‘স্বেচ্ছাকর্ম’ নামের একটি সংগঠন। এসব মানুষকে টিকা নিশ্চিত করে সংগঠনের সদস্যরা শহরের বিভিন্ন এলাকায় এলাকায় যাচ্ছেন। আজ শুক্রবার কর্মসূচির প্রথম দিনে পাঁচ শতাধিক মানুষের টিকার নিবন্ধন করেছেন তাঁরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথম দিনে সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশন ও বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খালপাড় এলাকায় এই কর্মসূচি চলে। সুরক্ষা অ্যাপের মাধ্যমে নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশনে ৩০০ জন ও খালপাড় এলাকায় ২০০ জনের টিকার নিবন্ধন করা সম্ভব হয়েছে। নিবন্ধিতদের সঙ্গে সঙ্গেই প্রিন্ট করে টিকাকার্ড দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব মানুষ এই কার্ড নিয়ে নির্ধারিত কেন্দ্রে গিয়ে টিকা নিতে পারবেন।
সংগঠনের সদস্যরা জানান, তাঁরা যাঁদের টিকার নিবন্ধন করে দিচ্ছেন, তাঁদের সবাই নিম্নবিত্ত ও সমাজের অসচেতন অংশ। কেউ রিকশা চালান, কেউ চা-সিগারেটের দোকান চালান, আবার কেউ দোকানের কর্মচারী। তাঁদের অধিকাংশই জানেন না, কীভাবে টিকার জন্য নিবন্ধন করতে হয়। আবার নিবন্ধন করতে প্রয়োজনীয় কম্পিউটার বা স্মার্টফোন তাঁদের নেই। নিবন্ধন করতে না পারায় অনেকে করোনার টিকা নিতে পারছেন না। এসব ব্যক্তিকে সাহায্য করতে বিভিন্ন সংগঠনের একদল কর্মী ‘স্বেচ্ছাকর্ম’ সংগঠনের ব্যানারে একত্র হয়েছেন।
‘স্বেচ্ছাকর্ম’–এর উদ্যোক্তাদের মধ্যে আছেন মাইনুল রহমান খান, হাসান মাহমুদ, ফাহিম সাদেক, অঞ্জন দাস, সুমন আজাদ, মমিন আফ্রাদ, সুব্রত কুমার দাস, শেখ শামীম, কাজী আনোয়ার ও অনির্বাণ মাহবুব। তাঁরা নরসিংদী শহরের বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য।
শুক্রবার বিকেলে খালপাড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দুই শতাধিক নারী-পুরুষ জড়ো হয়েছেন টিকার নিবন্ধন করতে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে দুজন নিবন্ধন করতে আসা নারী-পুরুষের আলাদা তালিকা করছেন, আরও দুজন তাঁদের নির্দিষ্ট সারিতে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। চারজন তাঁদের নিজেদের মুঠোফোন দিয়ে সুরক্ষা অ্যাপ থেকে তাঁদের নিবন্ধন করে দিচ্ছেন। আর দুজন একটি প্রিন্টারের মাধ্যমে তাঁদের টিকাকার্ড প্রিন্ট করে দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে লোকজনকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।
কর্মসূচির অন্যতম উদ্যোক্তা মাইনুল রহমান খান জানান, আজ সকাল ৮টা থেকেই মসজিদের মাইকে এবং নামাজ পড়তে আসা লোকজনকে বিনা মূল্যে টিকা নিবন্ধনের খবর জানিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া আশপাশের সব দোকানেও এই খবর পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে লোকজন টিকা নিবন্ধনের জন্য আসতে থাকেন। শনিবার (৭ আগস্ট) নরসিংদী বাজার এলাকায় এই কার্যক্রম চলবে।
খালপাড়ে টিকার নিবন্ধন করতে আসা মাকসুদুল ইসলাম (৫২) নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘কীভাবে টিকার জন্য নিবন্ধন করতে হয়, জানতাম না। তারা আমাদের এলাকায় এসে টিকা নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিল। এখন আর সমস্যা নেই, এই কার্ড নিয়ে গেলেই নাকি টিকা দিয়ে দেবে।’
আনোয়ারা বেগম (৬০) নামের এক নারী বলেন, ‘শুনছিলাম টিকার জন্য নাম লেখাইতে নাকি কম্পিউটারের দোকানে যাইতে হয়। আমি গরিব মানুষ, বিভিন্ন বাড়িতে কাজ কইরা খাই। টাকা দিয়া টিকার জন্য নাম লেখাইতে যাওয়া হইতো না। তারা টাকা ছাড়া নাম লেখাইয়া দিতাছে, এর লাইগা আইছি।’
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র নরসিংদীর সংগঠক আনিসুর রহমান ভূঁইয়া এসেছিলেন এই কার্যক্রম ঘুরে দেখতে। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর একদল কর্মী একত্র হয়ে চমৎকার একটি কাজ করছে। সুবিধাবঞ্চিত ও অসচেতন মানুষকে বিনা মূল্যে টিকার নিবন্ধন করে দেওয়া সত্যিই একটি মহৎ উদ্যোগ।’
নরসিংদীর সিভিল সার্জন মো. নূরুল ইসলাম বলেন, ‘করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা পেতে হলে অবশ্যই টিকা নিতে হবে। তবে টিকা নেওয়ার নিবন্ধন কীভাবে করতে হয়, তা অনেকেই জানেন না। তাঁদের জন্য যে উদ্যোগ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি নিয়েছে, আমি তার জন্য ধন্যবাদ জানাই। তবে তাঁদের প্রতি অনুরোধ, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং নারীরা যেন অগ্রাধিকার পান।’