প্রায় ১ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। অধ্যাপকের অনুমোদিত পদের ৯০ ভাগই শূন্য। ৪২ জন অধ্যাপকের মধ্যে আছেন চারজন।

বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে শিক্ষক–সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পিছিয়ে পড়ছেন ব্যবহারিক দিক দিয়ে। শিক্ষক–সংকটের কারণে চিকিৎসা ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা চালু করা যাচ্ছে না মেডিকেল কলেজটিতে। এ তো গেল মেডিকেল কলেজ অংশের কথা। হাসপাতালেও আছে জনবল ঘাটতি। অনেক যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে।
কলেজ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ৫২ বছরের পুরোনো এ মেডিকেল কলেজে বিভিন্ন বর্ষে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থী রয়েছেন। শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ২৯০টি। সেখানে আছেন ১০৫ জন, ১৮৫টি পদই শূন্য। অর্থাৎ ৬৪ শতাংশ শিক্ষক নেই কলেজটিতে। অনেক বিভাগেই বিশেষজ্ঞ শিক্ষক নেই। কলেজটিতে অধ্যাপকের অনুমোদিত পদের ৯০ ভাগই শূন্য। ৪২ জন অধ্যাপকের মধ্যে আছেন মাত্র চারজন।
আবার সহযোগী অধ্যাপকের ৭১ ভাগ, সহকারী অধ্যাপক পদে ৫৩ ভাগ এবং প্রভাষক, মেডিকেল অফিসার, প্যাথলজিস্ট, বায়োকেমিস্ট ও ফার্মাসিস্ট পদে ৬১ ভাগ জনবল শূন্য।
এ হাসপাতালে সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। সক্ষমতা না থাকায় আমরা রোগী এলেই ঢাকায় স্থানান্তর করতে বাধ্য হই। আমি দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরের কম সময়ের মধ্যে বিভিন্ন কয়েকটি অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগ চালু করতে সক্ষম হয়েছি। এ জন্য প্রয়োজনীয় জনবলও চাওয়া হয়েছে। এমনকি দীর্ঘদিন অচল থাকা গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি সচল করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছেহাসপাতালের পরিচালক এইচ এম সাইফুল ইসলাম
ডেন্টাল বিভাগে ৩৮ জন শিক্ষকের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৬ জন প্রভাষক, মাইক্রোপ্যাথলজি বিভাগে ১৬ জনের স্থলে আছেন একজন সহকারী অধ্যাপক ও ৫ জন প্রভাষক। এ ছাড়া অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, সার্জারি, মেডিসিন, নিউরো বিভাগসহ অন্য বিভাগের অবস্থা আরও শোচনীয়।
শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা অস্বস্তিতে
বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হলে তাঁরা জানান, শিক্ষক–সংকটের কারণে তাঁদের কাঙ্ক্ষিত পাঠদান হচ্ছে না। ব্যবহারিক দিক দিয়ে তাঁরা পিছিয়ে পড়ছেন। এভাবে জোড়াতালি দিয়ে অন্তত চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণ অসম্ভব ব্যাপার।
শিক্ষকদের মধ্যেও এ নিয়ে অস্বস্তি আছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী, পাঠদান করতে না পারা, বেশি সময় একাডেমিক কাজে ব্যয় করা এবং হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। এতে তাঁদের মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।
কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক এ কে এম আকবর কবির বলেন, শিক্ষক ও অন্যান্য জনবলসংকটের কারণে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে পাঠদান চালাতে হচ্ছে। কোভিড পরিস্থিতির কারণে বেশির ভাগ সময় করোনা পরীক্ষার জন্য আরটি–পিসিআর ল্যাবেও সময় দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে একটি অস্বস্তিকর অবস্থা চলছে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী পাঠদান করাতে না পেরে শিক্ষকেরাও অসন্তুষ্টিতে ভুগছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী বলছেন, অনেক জটিল বিষয় আছে, যেসব বিষয়ে অভিজ্ঞ অধ্যাপক না থাকলে বুঝতে অসুবিধা হয়। এর প্রভাব পড়ছে তাঁদের ফলাফলে।
শিক্ষকেরা জানান, বছরের পর বছর ধরে এমন শিক্ষক–সংকট থাকলেও কোনো সুরাহা হচ্ছে না। এ কলেজে ৫৬টি বিভাগের নিউরোসার্জারি, রক্ত সঞ্চালন, ক্যানসার, বার্ন, নিউরোমেডিসিন, মেডিসিন, গাইনিসহ ৫৪টি বিভাগে অধ্যাপক না থাকায় পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা পাচ্ছেন না শিক্ষার্থীরা।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেই অধ্যাপক না থাকায় কলেজে এমডি এবং এমএস কোর্স চালু করা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় হচ্ছে না। শিক্ষকশূন্যতার বিষয়ে প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও সুফল মিলছে না।
হাসপাতালেও নেই পর্যাপ্ত জনবল
কলেজের শিক্ষক–সংকটের প্রভাব পড়ছে হাসপাতালেও। ফলে হাসপাতালের অনুমোদিত পদের প্রায় অর্ধেক শূন্য। হাসপাতাল প্রশাসন সূত্র জানায়, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০০ শয্যার অনুকূলে ২২৪ চিকিৎসক পদের বিপরীতে রয়েছেন ১২১ জন। এর মধ্যে সংকট নিয়ে সম্প্রতি আরও সাতটি বহির্বিভাগ চালু হয়েছে এ হাসপাতালে।
হাসপাতাল প্রশাসন জানায়, এ হাসপাতালে অন্তর্বিভাগে ১৭টি এবং ১৭টি বহির্বিভাগ ছিল। কিন্তু ৩ ফেব্রুয়ারি বহির্বিভাগ নতুন চারটি ও অন্তর্বিভাগে তিনটি বিভাগ যুক্ত হয়েছে। এখন অন্তর্বিভাগে ২০টি, বহির্বিভাগ ২১টি ইউনিট রয়েছে। নতুন চারটি বহির্বিভাগ হচ্ছে ভাসকুলার সার্জারি, কার্ডিওলজি, ইউরোলজি ও গ্যাস্ট্রোলজি। এ ছাড়া তিনটি অন্তর্বিভাগ হচ্ছে নিউরোলজি, ডায়াবেটিক ও বার্ন ইউনিট।
হাসপাতালটি ৫০০ শয্যা থেকে ১ হাজার শয্যায় উন্নীত করা হলেও পুরোনো ৫০০ শয্যার জনবলকাঠামো দিয়েই চলছে। এই ৫০০ জনবলের চিকিৎসকেরও প্রায় অর্ধেক পদ শূন্য। অথচ এই হাসপাতালে ১ হাজার শয্যার অনুকূলে প্রতিদিন ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার রোগী ভর্তি থাকে। এ ছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ হাজার রোগী আসে চিকিৎসাসেবা নিতে। এ অবস্থায় চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সীমিত চিকিৎসকদের। আর রোগীরাও কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বিকল হয়ে আছে যন্ত্রপাতি
চিকিৎসকেরা জানান, একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে সব ধরনের রোগের চিকিৎসার অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগ সেবা থাকা অত্যাবশ্যক। কিন্তু এ হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্থানস্বল্পতায় বিভিন্ন রোগের সেবা কার্যক্রম চালু ছিল না। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন কমিটির সভায় হৃদ্রোগে বহির্বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগ খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ওই সিদ্ধান্তের দীর্ঘ সাত বছরেও বাস্তবে রূপ পায়নি। এবার সাতটি বিভাগ খোলার মধ্য দিয়ে তা পেলেও চিকিৎসক-সরঞ্জাম না পেলে তা সচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
হাসপাতাল প্রশাসন জানায়, চিকিৎসক ও স্থানস্বল্পতার কারণে এখন প্রতি রোববার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার ইউরোলজি বহির্বিভাগে চিকিৎসা দেবেন একজন চিকিৎসক। একই সময় হৃদ্রোগ বহির্বিভাগে একজন এবং ভাসকুলার সার্জারি বহির্বিভাগে চিকিৎসা দেবেন অপর একজন চিকিৎসক। এ ছাড়া প্রতি শনিবার, সোমবার ও বুধবার গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ইনডোর থেকে পাঠানো একজন চিকিৎসক রোগীদের এ রোগের চিকিৎসাসেবা দেবেন বলে স্থির হয়েছে।
হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, আধুনিক যন্ত্রপাতিগুলোর বেশির ভাগই বিকল। এর মধ্যে এনজিওগ্রাম, চোখের লেসিক, এমআরআই, সিটি স্ক্যান মেশিন দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। এ ছাড়া ক্যানসার রোগীদের জন্য কোবাল্ট-৬০ মেশিন, এনজিওগ্রাম মেশিন, দুই–তৃতীয়াংশ এক্স-রে মেশিন, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনও চলে জোড়াতালি দিয়ে। প্রায়ই এগুলো বিকল হয়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েন রোগীরা। রেডিওথেরাপি, রেডিও টেলিথেরাপি, ব্রাকিথেরাপি মেশিনসহ অন্যান্য থেরাপির মেশিনও অচল।
হাসপাতালের পরিচালক এইচ এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ হাসপাতালে সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। সক্ষমতা না থাকায় আমরা রোগী এলেই ঢাকায় স্থানান্তর করতে বাধ্য হই। আমি দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরের কম সময়ের মধ্যে বিভিন্ন কয়েকটি অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগ চালু করতে সক্ষম হয়েছি। এ জন্য প্রয়োজনীয় জনবলও চাওয়া হয়েছে। এমনকি দীর্ঘদিন অচল থাকা গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি সচল করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।’