
মুঠোফোনে এক বালু ব্যবসায়ীকে ফোন দিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন এক সন্ত্রাসী। চাঁদা না পেলে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। এরপরও চাঁদা না দেওয়ায় দুটি মোটরসাইকেলে করে এসে ওই ব্যবসায়ীকে গুলি করেন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। মৃত ভেবে আহত ব্যবসায়ীকে সেখানে ফেলে যাওয়ার সময় অস্ত্রধারীদের একজন বলেন, ‘সাজ্জাদ ভাইয়ের কথা ভালো লাগে নাই, এবার কবরে যা।’
চট্টগ্রামে ৯ মাস আগে সংঘটিত এ ঘটনায় সম্প্রতি ৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। অভিযোগপত্রে ঘটনার এই বিবরণ উঠে এসেছে। সাত আসামির মধ্যে বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ এবং তাঁর ছয় সহযোগী রয়েছেন।
ভুক্তভোগী বালু ব্যবসায়ীর নাম মোহাম্মদ ইউনুস। তিনি চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও থানার মোহরা এলাকার বাসিন্দা। গত বছরের ১ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁকে বাড়িতে গিয়ে গুলি করেন সন্ত্রাসীরা। তাঁর হাঁটু, কোমর, পাসহ শরীরের চারটি স্থানে গুলি লাগে। তাঁর চারটি দাঁতও এ সময় পড়ে যায়।
এ ঘটনায় পরদিন ইউনুসের স্ত্রী খোদেজা বেগম বাদী হয়ে সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীসহ নয়জনের নাম উল্লেখ করে চান্দগাঁও থানায় মামলা করেন। তবে পুলিশ দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পায়নি। তাই তাঁদের অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়।
পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়, গত বছরের ২০ জুলাই প্রথম দফায় সন্ত্রাসী সাজ্জাদ বিদেশি একটি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ব্যবসায়ী ইউনুসের কাছে ফোন করেন। এরপর বলেন, ‘ব্যবসা করতে হলে ৫০ লাখ টাকা দিতে হবে। নইলে জানে মেরে ফেলব।’ জবাবে ব্যবসায়ী ইউনুস চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানান। দুই দিন পর ২৩ জুলাই সাজ্জাদ আবারও ফোন করেন। এ সময় হুমকি দিয়ে ওই ব্যবসায়ীকে বলেন, ‘ঠিক আছে, টাকা নিয়ে কবরে যাবি।’
দ্বিতীয় দফা হুমকির পর ১ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরের চান্দগাঁওয়ের মোহরা এলাকায় দুটি মোটরসাইকেলে করে এসে মোহাম্মদ ইউনুসের বাসায় হানা দেন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকেন তাঁরা। এ সময় গুলিতে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ইউনুস। তাঁকে মৃত ভেবে চলে যাওয়ার সময় অস্ত্রধারীদের একজন বলতে থাকেন, ‘সাজ্জাদ ভাইয়ের কথা ভালো লাগে নাই, এবার কবরে যা।’ তবে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি।
গত বছরের ২০ জুলাই প্রথম দফায় সন্ত্রাসী সাজ্জাদ বিদেশি একটি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ব্যবসায়ী ইউনুসের কাছে ফোন করেন। এরপর বলেন, ‘ব্যবসা করতে হলে ৫০ লাখ টাকা দিতে হবে। নইলে জানে মেরে ফেলব।’ জবাবে ব্যবসায়ী ইউনুস চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানান। দুই দিন পর ২৩ জুলাই সাজ্জাদ আবারও ফোন করেন। এ সময় হুমকি দিয়ে ওই ব্যবসায়ীকে বলেন, ‘ঠিক আছে, টাকা নিয়ে কবরে যাবি।’
গত সোমবার চট্টগ্রাম আদালতে অভিযোগপত্রটি জমা দেয় চান্দগাঁও থানা-পুলিশ। এতে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ ছাড়াও আসামি করা হয়েছে তাঁর সহযোগী মোহাম্মদ হাসান, মোবারক হোসেন ওরফে ইমন, মোহাম্মদ রায়হান, ফাহমী নিজামী চৌধুরী, নুরুল হক ও কামাল উদ্দিন ওরফে বালু কামালকে। মোহাম্মদ আলম ওরফে ববি ও এরশাদ হোসেন নামের দুজনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে ১২ জনকে সাক্ষী রাখা হয়েছে।
অভিযোগপত্র দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আজিজুল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে বালু ব্যবসায়ী ইউনুসকে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ দফায় দফায় ফোন করে হুমকি দেন। শেষে তাঁর সহযোগীদের দিয়ে গুলি করেন। তিনি বলেন, তদন্তে বিদেশে থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে চাঁদা দাবি ও হুমকির তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। ঘটনায় জড়িত সাজ্জাদের সহযোগীদের ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা গেছে।
গুলিতে আহত বালু ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইউনুস এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি। গতকাল মঙ্গলবার রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখনো ভালোভাবে চলাফেরা করতে পারি না। ভয় কাজ করে, কখন আবার কী হয়ে যায়।’ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সাজ্জাদ বিদেশে বসে দেশে এসব করার সাহস কীভাবে পায়। তার সহযোগীরা এত অস্ত্র কোথা থেকে পায়। তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।’ তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাজ্জাদ আলী মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কারও কাছ থেকে চাঁদা চাইনি। ইউনুসকেও চিনি না।’
সাজ্জাদ বিদেশে বসে দেশে এসব করার সাহস কীভাবে পায়। তার সহযোগীরা এত অস্ত্র কোথা থেকে পায়। তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।মোহাম্মদ ইউনুস, ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী।
ভুক্তভোগী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে বসে চট্টগ্রামের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ। চাঁদা না পেলেই গুলি ছুড়ছেন তাঁর অনুসারীরা। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানার পাঁচ লাখের বেশি মানুষকে সাজ্জাদের বাহিনীর কারণে আতঙ্কে থাকতে হয়। সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গুলি করার অভিযোগ ওঠে সাজ্জাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এর আগে গত ২ জানুয়ারি ওই বাসায় গুলি করেছিলেন সন্ত্রাসীরা। এরপরও চাঁদা না পেয়ে দ্বিতীয় দফায় গুলি করা হয়। এর ২০ দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে ওই ব্যবসায়ীকে একটি বার্তা দেন সাজ্জাদ। এতে লেখা হয় ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’। গুলিতে ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বাসার জানালার কাচ ভেঙে গিয়েছিল। বাসার দরজায়ও গুলি লাগে। এর পর থেকে বাসাটিতে পুলিশ পাহারায় ছিল। পুলিশের পাহারার মধ্যেই বাসাটিতে আবারও গুলির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশ কয়েকজন আসামিকে ধরলেও অস্ত্রধারী রায়হান ও মোবারককে এখনো ধরতে পারেনি।
ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুরের বাসার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশ পরা চার ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে বাসার কাছে আসেন। এরপর বাসাটি লক্ষ্য করে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছুড়তে থাকেন। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানায়, চার সন্ত্রাসীর মধ্যে একজনের দুই হাতে দুটি পিস্তল ছিল। বাকি তিনজনের মধ্যে একজন সাবমেশিনগান (এসএমজি), একজন চায়নিজ রাইফেল এবং অন্যজন শটগান থেকে গুলি ছোড়েন।
স্মার্ট গ্রুপ একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী। ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের ছোট ভাই মুজিবুর রহমান ২০২৪ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে স্বতন্ত্র হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
কে এই সাজ্জাদ
নগরের চালিতাতলী এলাকার ঠিকাদার আবদুল গণির ছেলে সাজ্জাদ আলী খান মূলত অপরাধজগতে পরিচিত হন ১৯৯৯ সালে কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান খুনের পর। সাক্ষীর অভাবে ওই মামলায় খালাস হলেও নগরের অপরাধজগতে তাঁকে নিয়ে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়।
২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের ছয় নেতা-কর্মীসহ আটজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার দাবি ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত সেই হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাজ্জাদ। একই বছরের অক্টোবরে একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হন তিনি। পরে জামিনে বেরিয়ে ২০০৪ সালে দেশ ছাড়েন। এর পর থেকেই বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন তাঁর বাহিনী। অবশ্য ‘এইট মার্ডার’ মামলা থেকেও খালাস পান সাজ্জাদ।
শুরুতে নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন, আকবর আলী ও ছোট সাজ্জাদকে নিয়ে গড়ে ওঠে সাজ্জাদের বাহিনী। ম্যাক্সন ভারতে মারা যান, সরোয়ার দল ছাড়েন। গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনী গণসংযোগে সরোয়ারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের জন্যও বড় সাজ্জাদকে দায়ী করা হয়।
পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশের বাইরে বসেই সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী নিয়ন্ত্রণ করছেন নগর ও জেলার বিস্তৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। সাজ্জাদ ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামির তালিকায় আছেন। তালিকা অনুসারে তাঁর নাম সাজ্জাদ খান।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত জেলায় ২টি জোড়া খুনসহ ১০টি খুনে সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। তাঁরা কখনো আধিপত্য বজায় রাখতে নিজেদের প্রতিপক্ষকে খুন করছেন। আবার কখনো ভাড়াটে খুনি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছেন। ২০১৫ সাল থেকে দেশে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর নেতৃত্বে আসেন ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে সক্রিয় রয়েছেন অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী। গত ১৫ মার্চ ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর নেতৃত্ব আসে ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের হাতে।