বাচ্চারা ঢুকছে শ্রেণিকক্ষে আর মায়েরা বসছেন সেলাইয়ের কাজ নিয়ে। ১৫-২০ জন একসঙ্গে বসে কাঁথায় নকশা তুলছেন আর গল্প করছেন। পাশে দাঁড়িয়ে সে গল্প বোঝা যায় না। কারণ, তাঁরা কথা বলছেন সাঁওতালি অথবা মাহালি ভাষায়। এই দৃশ্য দেখা যায়, রাজশাহীর পবা উপজেলার ভুগরইল খ্রিষ্টানপাড়া গ্রামে। বিদ্যালয়ের নাম ‘শিশুপ্রভাত বিদ্যানিকেতন’।
জানা গেল, এই কাঁথা সেলাইয়ের আয় থেকেই চলছে বিদ্যালয়টি। একজন মা বললেন, ‘মাকার কি ইশকুলে বে আমালকো লেখাপড়া মিললেনি।’ যা বাংলা তরজমা করলে দাঁড়ায়, ‘এই স্কুল না থাকলে আমাদের বাচ্চারা লেখাপড়া শিখতে পারত না।’
নারীদের কাজের পাশাপাশি শিশুদের লেখাপড়ার এই ব্যবস্থা হয়েছে সুমী মুর্মু নামের এক নারীর উদ্যোগে। তিনি স্থানীয় নারীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘নারী ও শিশুকল্যাণ সংস্থা’। তাঁদের বাইরের কোনো তহবিল নেই। নারীদের হাতের কাজের আয় দিয়েই সংস্থার ব্যয় মেটানো হয়।
কাজের দক্ষতা অনুযায়ী তাঁরা মাসে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন।
সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা ‘নারী ও শিশুকল্যাণ সংস্থা’র তৈরি একেকটি নকশিকাঁথা ৮০০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। মাসে গড়ে ১৫০টি কাঁথা বিক্রি হয়। কয়েরদাঁড়া খ্রিষ্টানপাড়ায় নিজ বাড়ির আঙিনায় ও বাইরে ‘প্রকৃতি কালেকশন’ নামের দুটি বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন সংস্থার পরিচালক সুমী মুর্মু। এই কাজে এখন তাঁর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ১৭২ নারী। তাঁদের কেউ কাঁথা সেলাই করেন, কেউ ব্লক প্রিন্টের কাজ করেন। কেউ কাঁথাগুলোকে পরিষ্কার ও ইস্তিরি করে বিক্রয়কেন্দ্রের জন্য প্রস্তুত করেন। এ ছাড়া বিক্রয়কেন্দ্রেও রয়েছেন ছয়জন নারী বিক্রয়কর্মী। কাজের দক্ষতা অনুযায়ী তাঁরা মাসে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন।
নারীদের কাজের পাশাপাশি শিশুদের লেখাপড়ার এই ব্যবস্থা হয়েছে সুমী মুর্মু নামের এক নারীর উদ্যোগে। তিনি স্থানীয় নারীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘নারী ও শিশুকল্যাণ সংস্থা’। তাঁদের বাইরের কোনো তহবিল নেই। নারীদের হাতের কাজের আয় দিয়েই সংস্থার ব্যয় মেটানো হয়।
সুমী মুর্মুর বাবা আলবেট মুর্মু রাজশাহী সেনানিবাসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। তিনি ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখতেন; কিন্তু যা বেতন পেতেন, তাতে সংসার খরচ মেটানোই দায় ছিল। মাকে মাঠের কাজেই যেতে হতো। তবে সুবিধা ছিল সুমীর মা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিলেন। সুমীরা পাঁচ ভাই–বোন মায়ের কাছেই হাতেখড়ি নিয়েছিলেন। অভাবের কারণে প্রাইভেট টিউটরদের ঠিকমতো বেতন দিতে পারতেন না। টিফিনের সময় পানি খেয়ে থাকতে হতো।
১৯৯৬ সালে সুমি ভর্তি পরীক্ষায় ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে ভর্তির সুযোগ পান। সেখান থেকেই ২০০৬ সালে এসএসসি পাস করেন। ভর্তি হন রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজে।
তবে এসএসসি পরীক্ষার পরই পরিবারের চাপে সুমীকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই মা হন। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ইচ্ছা আর পড়াশোনার দরকার নেই; কিন্তু সুমী শিশুসন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে বই নিয়ে বসেন। এভাবে এইচএসসি পাস করেন। এরপর রাজশাহী কলেজ থেকে ২০১৩ সালে স্নাতক (পাস কোর্স) ও ২০১৫ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বিরতি দিয়ে পরে বিএড ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং বিভাগের এমবিএ করেছেন।
লেখাপড়া শেষ করে সুমী মুর্মু একটি বেসরকারি ব্যাংকের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগদান করেন। বছর দুই চাকরি করেন; কিন্তু নিজ সম্প্রদায়ের নারীদের জীবনছবি তাঁর চোখে ভাসতে থাকে। তিনি দুই বছরের মাথায় চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। সঞ্চিত অর্থ নিয়ে নিজের সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নের জন্য আত্মকর্মসংস্থানের কথা ভাবেন। যুব উন্নয়ন থেকে সেলাইয়ের ওপরে প্রশিক্ষণ নেন। নিজের বাসায় নকশিকাঁথা তৈরি শুরু করেন। এবার নিজের সম্প্রদায়ের মাঠে খাটা নারীদের হাতে কাজ তুলে দেন।
সুমী মুর্মুর মতে, এটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের অশিক্ষা, মাদকাসক্তি, নারী নির্যাতন ও বাল্যবিবাহের চিরচেনা সংকট থেকে বের হয়ে আসার একটি উদ্যোগ। তাঁর ভাষায়, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মায়েরা সকালে উঠে মাঠের কাজে বের হয়ে যান। বিকেলে এসে পরিবারের কাজ করেন। তারা বাচ্চাদের কোনো সময় দিতে পারেন না। বাচ্চারা নিজেদের মতো ধুলামাটি মেখে বড় হয়ে বাবা-মায়ের পেশায় যোগ দেয়। তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে না।’
যুব উন্নয়ন থেকে সেলাইয়ের ওপরে প্রশিক্ষণ নেন। নিজের বাসায় নকশিকাঁথা তৈরি শুরু করেন। এবার নিজের সম্প্রদায়ের মাঠে খাটা নারীদের হাতে কাজ তুলে দেন।
কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হওয়া নারীদের এখন আর মাঠে যেতে হয় না। তাঁরা বাচ্চাদের পড়াশোনায় সময় দেন। পরিবারে বাড়তি আয়েরও জোগান দিচ্ছেন। কয়েরদাঁড়া খ্রিষ্টানপাড়া মহল্লার অ্যামেলি বাষ্কী (২৫) কাঁথা সেলাই করেন। তিনি বলেন, ‘আমার আগে সংসারে অনেক অভাব ছিল। জ্বর এলে নিজের ইচ্ছায় একটা বড়ি (ওষুধ) কিনতে পারতাম না। এখন সুমি দিদির এখানে কাজ করে অনেক ভালো আছি। বাচ্চার পড়ালেখার খরচ দিতে পারি। সময় দিতে পারি। একই সঙ্গে মাসে ছয় থেকে আট হাজার টাকা রোজগার করতে পারছি।’
ভুগরইল গ্রামের সুমি বিশ্বাস (৩৭) বলেন, ‘আমি আগে মাঠে কাজ করতাম। সুমি দি আমাকে সেলাইয়ের প্রোগ্রাম দিয়েছে। এই প্রোগ্রামে কাজ করি। ছেলেপেলেদের লেখাপড়া শিখাচ্ছি। খরচ দিতে পারি। নিজেও যেটা মনে ধরে কিনতে পারি। মাসে প্রায় আট হাজার টাকা আয় হয়।’
একই গ্রামে মারীয়া বিশ্বাস (৩৬) নতুন এসেছেন। তিনি জানান, মাসে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় করেন। এই প্রতিষ্ঠানে এসে হাতের কাজ শেখার পর সংসারে আগের চেয়ে অনেক ভালো আছেন।
আমি আগে মাঠে কাজ করতাম। সুমি দি আমাকে সেলাইয়ের প্রোগ্রাম দিয়েছে। এই প্রোগ্রামে কাজ করি। ছেলেপেলেদের লেখাপড়া শিখাচ্ছি। খরচ দিতে পারি। নিজেও যেটা মনে ধরে কিনতে পারি। মাসে প্রায় আট হাজার টাকা আয় হয়।সুমি বিশ্বাস
সংস্থার সদস্যরা জানান, আগে তাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বাহারি ফুল ও নকশা ফুটিয়ে তুলতেন নকশিকাঁথায়। এখন অনলাইনে কাঁথার অনেক নকশা পাওয়া যায়। তারা সেখান থেকে ৩০০ ধরনের নকশার কাঁথা তৈরি করছেন। ফলে কাঁথায় আরও বেশি নতুনত্ব এসেছে।
বর্তমানে নকশিকাঁথায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে পদ্ম, শাপলা, গোলাপ কিংবা জুঁই। অনেক কাঁথার মাঝে থাকে বড় একটি পদ্মফুলের নকশা, চারদিকে ছড়িয়ে থাকে লতা-পাতা আর ছোট ছোট ফুল। এতে কাঁথাজুড়ে তৈরি হয় একধরনের ছন্দময় ভারসাম্য। ফুলের পাশাপাশি নকশিকাঁথায় জ্যামিতিক নকশারও বিশেষ উপস্থিতি রয়েছে। বৃত্ত, চতুর্ভুজ কিংবা তারকা আকৃতির নকশা কাঁথাকে দেয় শৈল্পিক ছোঁয়া।
প্রাণী ও পাখির নকশারও চল রয়েছে। তার মধ্যে ময়ূরের পেখম, মাছের চলন কিংবা পাখির যুগল চিত্র গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ককে তুলে ধরে নকশিকাঁথায়।
কাঁথা সেলাইয়ের কাজ শুরুর পর সুমী লক্ষ্য করেন, তাঁর সেলাইয়ের কাজের সঙ্গে নগরের কয়েরদাঁড়া খ্রিষ্টানপাড়া ও পবা উপজেলার ভুগরইল গ্রামের মেয়েরা বেশি জড়িত। এর মধ্যে ভুগরইল গ্রামে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। গ্রামের গির্জার পাশে মিশন থেকে একটি বেসরকারি সংস্থা স্কুল চালাচ্ছিল। প্রকল্প শেষে তারা বিদ্যালয় ফেলে চলে গেছে। তারপর থেকে এলাকার শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।
সুমী তখন ফাদারের কাছে এই বিদ্যালয় চালানোর প্রস্তাব করেন। প্রতিমাসে ঘরভাড়া দিতে হয় ১ হাজার টাকা। শিক্ষক কর্মচারী পাঁচজন। চারজন শিক্ষক ও একজন আয়া। শিক্ষকদের তিন হাজার ও আয়াকে মাসে দুই হাজার টাকা করে বেতন দিতে হয়। সব ব্যয় সংস্থা থেকে মেটানো হয়।
সুমি ২০২২ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ‘নারী ও শিশুকল্যাণ সংস্থা’র নিবন্ধন নেন। সেখানে সংস্থার কাজের পরিধি হিসেবে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য বিদ্যালয় পরিচালনার কথাও বলা হয়। তখন অধিদপ্তর থেকে তাঁকে শর্ত দেওয়া হয়—বিদ্যালয়ে শুধু নিজের সম্প্রদায় নয়, সব সম্প্রদায়ের শিশুদের পড়ার সুযোগ দিতে হবে। তিনি সেই শর্তেই কাজ শুরু করেন।
একইভাবে উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামে মিশনের আরেকটি পরিত্যক্ত বিদ্যালয়ে সুমি একইভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছেন। এতে প্লে থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত সব সম্প্রদায়ের শিশুরা পড়াশোনা করছে।
সন্তোষপুর স্কুলে গিয়েও একই দৃশ্য দেখা গেল। দুটি বিদ্যালয় পরিপাটি করে সাজানো। শিক্ষকেরা একই ধরনের শাড়ি পরে এসেছেন। নোটিশ বোর্ডেও হাতের সুন্দর লেখার নোটিশ। ভুগরইল গির্জার ফাদার লিটন কস্তা বলেন, পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের শিশুদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য তারা নামমাত্র ভাড়ায় বিদ্যালয় ভবনটি ব্যবহার করতে দিয়েছেন।
সম্প্রতি ভুগরইল বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ক্ষদ্র জাতিগোষ্ঠীর বাচ্চাদের সঙ্গে একই বেঞ্চে বসে পড়ছেন আবদুস সামি, আলভী, রাফি ও আক্তার হোসনা, অনিষা ভূঁইয়া, শ্রী মাহির। তাঁদের দেখে বোঝার উপায় নেই তারা কোন সম্প্রদায়ের মানুষ। ভুগরইল গ্রামের অভিভাবক মুক্তি বিশ্বাসের ছেলে বর্ষণ বিশ্বাস নার্সারিতে পড়ে। তিনি বলেন, ‘অনেক দূরে স্কুল। এই স্কুল না থাকলে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা হতো না।’
সন্তোষপুর স্কুলে গিয়েও একই দৃশ্য দেখা গেল। দুটি বিদ্যালয় পরিপাটি করে সাজানো। শিক্ষকেরা একই ধরনের শাড়ি পরে এসেছেন। নোটিশ বোর্ডেও হাতের সুন্দর লেখার নোটিশ। ভুগরইল গির্জার ফাদার লিটন কস্তা বলেন, পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের শিশুদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য তারা নামমাত্র ভাড়ায় বিদ্যালয় ভবনটি ব্যবহার করতে দিয়েছেন।