পেছনে থরে থরে সাজানো ক্রেস্ট আর জার্সি। ফুটবলার সাজ্জাদ হোসেনের পথচলাটা মোটেও সহজ ছিল। চট্টগ্রামের পটিয়ায় সাজ্জাদের বাসভাবনে
পেছনে থরে থরে সাজানো ক্রেস্ট আর জার্সি। ফুটবলার সাজ্জাদ হোসেনের পথচলাটা মোটেও সহজ ছিল। চট্টগ্রামের পটিয়ায় সাজ্জাদের বাসভাবনে

টিনের চাল দিয়ে পড়ত পানি, কুঁড়েঘরে বেড়ে ওঠা ছেলেটি যেভাবে জাতীয় অঙ্গনের ফুটবলার

পটিয়ার বাঁশের বেড়া ও জং ধরা টিনের কুঁড়েঘর থেকে উঠে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলে খেলেছেন সাজ্জাদ হোসেন। দারিদ্র্য, অনিয়মিত অনুশীলন ও নানা বাধা পেরিয়ে ক্লাব ফুটবলে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাব ও টুর্নামেন্টে সাফল্য পেয়েছেন। এখন ফুটবলেই বদলেছেন নিজের ও পরিবারের জীবন।

পটিয়ার দক্ষিণ গোবিন্দারখীলের যে বাড়িতে একসময় সাজ্জাদ হোসেনের পরিবার থাকত, সেখানে ছিল বাঁশের বেড়া আর জং ধরা টিনের চালার ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর। দুই কক্ষের সেই ঘরে বৃষ্টি হলে টিনের চাল চুইয়ে পানি পড়ত। তখন পরিবারের সবাইকে এক কক্ষে গাদাগাদি করে থাকতে হতো। দিনমজুর বাবা কবির আহমদের সামান্য আয়েই চলত সংসার। অনেক সময় পরিবারের সবার খাবারও জুটত না। সেই অভাবের মধ্যেই লেখাপড়া চালিয়ে গেছে। দেখতেন ফুটবল খেলার স্বপ্নও। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছিল না, ছিল না নিয়মিত অনুশীলনের নিশ্চয়তা। তবু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কমেনি। বরং প্রতিকূলতার মধ্যেই নিজের ওপর বিশ্বাস তৈরি করেছিলেন তিনি। এখন সেই জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরের জায়গা বদলে গেছে, বদলে গেছে সাজ্জাদের জীবনও। নিজের উপার্জনের টাকায় প্রায় ৩৫ লাখ টাকা খরচ করে বানানো পাকা দোতলা বাড়িতে থাকেন ৩১ বছর বয়সী এই ফুটবলার। বাড়ির পরিপাটি ঘরে সাজানো রয়েছে তাঁর খেলার বিভিন্ন ক্রেস্ট, সনদ ও জার্সি। একসময় যে ছেলেটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতেন এলাকার অনেকে, সেই সাজ্জাদই এখন বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ে খেলছেন। খেলেছেন জাতীয় দলের হয়েও।

সাজ্জাদ হোসেনের জাতীয় দলে অভিষেক হয় ২০২২ সালে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে। এর আগে ২০২১-২২ মৌসুমে সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগেও খেলেন। বর্তমানে খেলছেন ঢাকার রহমতগঞ্জ এমএফসি ক্লাবে। দেশের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলা, শীর্ষ ক্লাবে খেলা—সবকিছুর শুরু অবশ্য সেই ছোট্ট কুঁড়েঘর থেকে।

ভাঙা এই কুড়ের ঘরে বেড়ে ওঠেন সাজ্জাদ হোসেন

গ্রামের মাঠ থেকে জাতীয় স্টেডিয়ামে

সাজ্জাদের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে আর্থিক কষ্টের মধ্যে। পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ গোবিন্দারখীল ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ছালেহ আহমদ সওদাগরের বাড়ির মৃত কবির আহমদের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বাবা ছিলেন দিনমজুর। মা, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে তাঁকে অনেক কষ্ট করতে হতো। বড় ছেলে হিসেবে সাজ্জাদকেও পড়ালেখার ফাঁকে বাবার সঙ্গে কাজে যেতে হয়েছে। কখনো বড় ভাইদের সঙ্গে মানুষের কাজে গেছেন।

নিজের উপার্জনের টাকায় প্রায় ৩৫ লাখ টাকা খরচ করে বানানো পাকা দোতলা বাড়িতে থাকেন ৩১ বছর বয়সী এই ফুটবলার। বাড়ির পরিপাটি ঘরে সাজানো রয়েছে তাঁর খেলার বিভিন্ন ক্রেস্ট, সনদ ও জার্সি। একসময় যে ছেলেটিকে নিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতেন এলাকার অনেকে, সেই সাজ্জাদই এখন বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ে খেলছেন। খেলেছেন জাতীয় দলের হয়েও।

এমন দিনও গেছে, পরিবারের সবাই মিলে খাবার খেতে পারেননি। অভাবের সংসারে পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবল খেলাটা চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। তবু ফুটবল ও পড়ালেখার প্রতি তাঁর ভালোবাসা কমেনি। পটিয়া মোহছেনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হন এ এস রাহাত আলী উচ্চবিদ্যালয়ে। স্কুলে পড়ার সময় প্রায় প্রতিদিন টিফিনের ছুটিতে পাশের পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে যেতেন। সেখানে বড়দের ফুটবল অনুশীলন দেখতেন। তাঁদের খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে বাড়ি ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতেন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বন্ধুরা মিলে একটি ফুটবল কিনেছিলেন। সেই বল নিয়ে পাড়ায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলাই হয়ে ওঠে তাঁর নিত্যদিনের আনন্দ। সাজ্জাদের ভাষায়, বলতে গেলে সেটিই ছিল তাঁর ফুটবলের হাতেখড়ি।

ফুটবলে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু হয় ২০০৬ সালের দিকে। বন্ধুদের নিয়ে ‘পটিয়া জুনিয়র স্পোর্টিং ক্লাব’ নামে একটি ক্লাব গঠন করেন সাজ্জাদ। সেই ক্লাবের হয়ে এলাকার বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলতেন। তাঁর খেলা দেখে অনেকে উৎসাহ দিয়ে বলতেন, এই ছেলে একদিন ভালো ফুটবলার হবে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাড়ির পাশের ডাকবাংলো মোড়ে অবস্থিত পটিয়া ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব থেকে একটি ফরম নিয়ে ভর্তি হন। ক্লাবের খেলোয়াড়দের সঙ্গে অনুশীলনও শুরু করেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় নিয়মিত অনুশীলনে আসতে পারতেন না। কখনো বাবার সঙ্গে কাজে যেতে হতো, কখনো বড় ভাইদের সঙ্গে। কিছুদিন একটি এনজিওতেও চাকরি করেছিলেন। ফলে ফুটবল খেলার ইচ্ছা থাকলেও মাঠে নিয়মিত থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। এ সময় এলাকার হাজী মোহাম্মদ নবী সওদাগর তাঁর পাশে দাঁড়ালেন। সাজ্জাদকে একজোড়া বুট কিনে দিয়েছিলেন তিনি। ছোট ছোট এই সহযোগিতাগুলোই তখন সাজ্জাদের কাছে বড় প্রেরণা হয়ে উঠেছিল।

মাঠে ফুটবলার সাজ্জাদ হোসেন

তবে সাজ্জাদের ফুটবলার হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল পটিয়া ব্রাদার্স ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এ টি এম মুহিবুল্লাহ চৌধুরীর। ক্লাবে ভর্তি হওয়ার পরও সাজ্জাদ নিয়মিত অনুশীলনে না আসায় একবার তিনি ডেকে পাঠান। ২০১০ সালের কথা। মুহিবুল্লাহ সরাসরি প্রশ্ন করেন, সাজ্জাদ ফুটবল খেলতে চায় কি না। তাঁর উৎসাহে সাজ্জাদ আবার নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন। অনুশীলতে এলে নাশতার জন্য টাকাও পেতেন। সাজ্জাদ মনে করেন, তাঁর অনুপ্রেরণাই সাজ্জাদকে এত দূর এগিয়ে দিয়েছে। এই অবদান তিনি কখনো ভুলতে চান না।

জামাল ভূঁইয়া যা বললেন

এরপর আসে সাজ্জাদের ফুটবলজীবনের প্রথম বড় বাঁক। ২০১২ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) উদ্যোগে পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে উপজেলা পর্যায়ে খেলোয়াড় বাছাইয়ের আয়োজন করা হয়। সেখানে দেড় শতাধিক খেলোয়াড় অংশ নেন। তাঁদের মধ্য থেকে মাত্র পাঁচজনকে বাছাই করা হয়। সাজ্জাদ ছিলেন সেই পাঁচজনের একজন। পরে বিভিন্ন উপজেলা থেকে নির্বাচিত খেলোয়াড়দের মধ্য থেকে চট্টগ্রাম জেলায় ৮৫ জন বাছাই করা হয়। তাঁদের মধ্য থেকে ১৫ জনকে নিয়ে গঠন করা হয় চট্টগ্রাম বিভাগীয় দল। সেই দলেও জায়গা পান সাজ্জাদ। চট্টগ্রামের ফুটবল কোচ প্রবীণদা তাঁকে ২০১২ সালে ‘চট্টগ্রাম পাইওনিয়ার ব্লু স্টার’-এর হয়ে খেলার সুযোগ দেন। এরপর ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পটিয়া উপজেলা ফুটবল দলের হয়ে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বিভাগ, প্রথম বিভাগ ও চট্টগ্রাম প্রিমিয়ারে খেলেন। ২০১৫ সালে ‘ঢাকা কদমতলা সংসদ’-এর হয়ে তৃতীয় বিভাগে খেলেন। ধীরে ধীরে পটিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে তাঁর খেলার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম আবাহনী ও পটিয়া উপজেলা ফুটবল দলের একটি প্রীতি ম্যাচে তাঁর খেলা নজর কাড়ে তৎকালীন চট্টগ্রাম আবাহনীর ম্যানেজার আরমান আজিজের। তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার জন্য সাজ্জাদকে সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবে চুক্তিবদ্ধ করেন তিনি। মূলত এভাবেই তাঁর এগিয়ে যাওয়া।

জাতীয় দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়ার সঙ্গে সাজ্জাদ হোসেন

জাতীয় দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়ারও সঙ্গেও খেলেছেন সাজ্জাদ। সাজ্জাদের বিষয়ে জানতে চাইলে ডেনমার্ক থেকে মুঠোফোনে জামাল ভূঁইয়া বলেন, ২০১৭ সাল থেকে পাঁচ বছর সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবে সাজ্জাদের সঙ্গে খেলেছেন তিনি। তাঁর মতে, সাজ্জাদ ভালো মানের খেলোয়াড় এবং জাতীয় দলের হয়েও দুর্দান্ত খেলেছেন। দলকে শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করতেন, গোল করার জন্য মরিয়া থাকতেন।

যদি উড়তে না পারো

অনেক মানুষের কাছে সাজ্জাদ ঋণী। তবে তাঁর বেড়ে ওঠার পেছনে মানুষটি আর কেউ নয়, তাঁর বাবা কবির আহমদে। পারিবারিক দুরবস্থা সত্ত্বেও বাবা চাইতেন ছেলে লেখাপড়া করুক। খেলাধুলার চেয়ে পড়াশোনায় বেশি মনোযোগ দিক। বড় হয়ে ভালো চাকরি করে পরিবারের সুনাম অর্জন করুক—এটাই ছিল তাঁর আশা।

সাজ্জাদ বলেন, ফুটবল খেলে তিনি এত দূর এগিয়ে যাবেন, তাঁর বাবা তা কল্পনাও করতে পারেননি। বাবা আজ বেঁচে থাকলে তাঁর সাফল্য দেখে আরও বেশি আস্থা ও বিশ্বাস পেতেন বলে মনে করেন তিনি। এলাকার অনেক মানুষও তাঁকে ফুটবল খেলতে দেখে নানা কথা বলতেন। ফুটবল খেলে ভবিষ্যতে কিছু করা যাবে না—এমন কথাও শুনতে হয়েছে। এসব কারণে কখনো কখনো তাঁর মা হতাশ হতেন। কিন্তু সাজ্জাদ যখন নাছোড়বান্দার মতো মাঠে যেতেন, তখন মা আবার উৎসাহ দিতেন এবং ছেলের ওপর বিশ্বাস রাখতেন। ২০১৭ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর খেলাধুলাই হয়ে ওঠে পরিবারের হাল ধরার উপায়। বড় বোন এসএসসি পাস করার পর তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। ছোট ভাই আজাদ হোসেন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। বর্তমানে সাজ্জাদের অর্থায়নে পটিয়ায় একটি গ্রিল ওয়ার্কশপের দোকান করেছেন তিনি। নিজের সাফল্যের সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করছেন সাজ্জাদ।

নিজের দোতলা বাড়িতে বসে সাজ্জাদ বলেন বলেন, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দমে যাননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ‘যদি উড়তে না পারা যায়, তাহলে দৌড়াতে হবে, দৌড়াতে না পারলে হাঁটতে হবে। হাঁটতে না পারলে হামাগুড়ি দিতে হবে। কিন্তু থামব না।’