
বেদেপাড়াটিতে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বসবাস। নারীদের বড় একটি অংশ কবিরাজিসহ বিভিন্ন চিকিৎসায় জড়িত। আর পুরুষেরা বানর নাচানো, রাশিফল দেখা ও সোনা-রুপা খোঁজার কাজ করে সংসার চালান।
৪০ বছর বয়সী ইউসুফ আলীর চার সন্তান। প্রতিদিন সকালে যন্ত্রপাতি হাতে বেরিয়ে পড়েন সোনা, রুপা খোঁজার কাজে। কখনো কাজ মেলে আবার কখনো ফিরতে হয় খালি হাতে। গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে গেরস্তবাড়িতে পানিতে হারানো সোনা খুঁজে দেন তিনি। কাজে সফল হলে সেদিন ইউসুফের রোজগার হয় ভালো। বিকেলে ঘরে কিনে নিয়ে যান চাল, ডাল, তেল, লবণ। ভাবনাহীন কাটে কয়েক দিন। বিচিত্র পেশার মানুষ ইউসুফ আলীর বাড়ি মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের মধ্যম সোনাপাহাড় বেদেপাড়ায়। ৪০ বছর বয়সী ইউসুফ ২২ বছর ধরেই সোনা–রুপা খোঁজার কাজ করছেন।
মধ্যম সোনাপাহাড় এলাকায় অবস্থিত বেদেপাড়াটি ঢাকা-চট্টগ্রাম নতুন মহাসড়কের দুই পাশজুড়ে। জোরারগঞ্জ বাজার থেকে পাকা সড়ক ধরে কিছুটা পূর্ব দিকে গেলেই চোখে পড়ে পাড়াটি। পাকা রাস্তার দুই পাশে গলিতে সারি সারি টিনশেডের ঘর। সেসব ঘরের ফাঁক গলে চোখে পড়ে দু–একটা ছোট দালান। গলির মুখের দোকানগুলোতে অবসরে আড্ডা জমানো মানুষের ভিড়। গলি ধরে এগিয়ে গেলেই দেখা যায়, ঘরের সামনে আলগা চুলায় রান্নায় ব্যস্ত বেদে নারীরা। গলিতে গলিতে ছোটাছুটি আর চিৎকার–চেঁচামেচি করে খেলছে শিশুরা।
দুই দশকের বেশি সময় এ কাজ করে এ পর্যন্ত অন্তত ২০ ভরির বেশি সোনার গয়না খুঁজে দিয়েছেন ইউসুফ। তিন বছর আগে একবার চট্টগ্রামের চকরিয়া উপজেলার মগবাজার এলাকায় এক গৃহস্থের বাড়ির সামনের পুকুর থেকে এক ভরি ওজনের সোনার চেইন খুঁজে দিয়েছিলেন তিনি। মজুরির পরও তাঁরা খুশি হয়ে পাঁচ হাজার টাকা বকশিশ দিয়েছিলেন।
এক গলির মুখে কথা হয় পাড়ার বাসিন্দা ইউসুফ আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, মিরসরাই উপজেলার মধ্যম সেনাপাহাড় বেদেপাড়ায় প্রায় চার হাজার মানুষের বাস। পাড়ার বাসিন্দাদের মধ্যে নারীদের বড় একটি অংশ দাঁত–কানের পোকা ফেলা, তন্ত্রমন্ত্র ইত্যাদি করে আয় করেন। পুরুষেরা বানর নাচানো, ভাগ্য গণনা আর সোনা–রুপা খোঁজার কাজ করেন। এ বেদেপাড়ার অন্তত ২০০ মানুষ সারা দেশে ঘুরে সোনা–রুপা খোঁজার কাজ করেন। এটি তাঁদের আদি পেশা।
ইউসুফ আলীর মতোই এ পেশায় জড়িত পাড়ার বাসিন্দা মুক্তার হোসেন, মোহাম্মদ ইমরান, মোহাম্মদ আরাফাত ও মোহাম্মদ মোরশেদ। তাঁদের সবার ঝুলিতেই বিচিত্র অভিজ্ঞতা। নানা গল্প জমা।
ইউসুফ আলী বলেন, পড়াশোনা করা হয়নি তাঁর। ২২ বছর আগে বাবা নজরুল ইসলামের কাছে শিখে সোনা–রুপা খোঁজার কাজ শুরু করেন তিনি। নিজের উপজেলার গণ্ডি পেরিয়ে এখন কাজ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যান তিনি। ইউসুফ বলেন, গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ডুগডুগি বাজিয়ে উচ্চ স্বরে সোনা–রুপা তালাশের কথা জানান দেন। আওয়াজ শুনলে যেসব বাড়ির মানুষের সোনা হারায়, তাঁরা ডেকে নিয়ে যান। হারানো সোনার আনাপ্রতি ৩০০ টাকা পারিশ্রমিক দাবি করেন তিনি। তিনি জানান, দরদাম ঠিক হলে প্রথমে যাঁদের সোনা হারায়, তাঁদের মাধ্যমে সম্ভাব্য জায়গাটি চিহ্নিত করেন। এরপর মাঝখানে কাঠের হাতল লাগানো প্লাস্টিকের বিশেষ ধরনের একটি ঝুড়ি সোনা হারানোর স্থানটির আশপাশে পানির নিচে কাদামাটিতে চেপে ধরেন। তারপর কাঠের লাঠির মাথায় লোহার চিরুনি লাগানো বিশেষ যন্ত্র দিয়ে চারদিক থেকে কাদামাটি টেনে এনে ঝুড়িতে জড়ো করেন। সেসব কাদামাটি পানিতে ধুয়ে অবশিষ্ট আবর্জনা ওপরে তুলে আনেন। সে আবর্জনা ঘেঁটে হারানো সোনা খোঁজা হয়। এভাবে পানিতে নেমে একই কায়দায় বারবার হারিয়ে যাওয়া সোনা খোঁজা হয়।
পুকুর ভরাট হওয়ায় মানুষের ঘরের ভেতর গোসল করার প্রবণতা বাড়ছে। ইউসুফ আলী বলেন, পুকুর না থাকায় আগের মতো সোনা হারায় না, কাজও মেলে না তেমন। কোনো মাসে ৮ হাজার আবার কোনো মাসে ১০ টাকা আয় হয় তাঁর।
ইউসুফ আলী বলেন, ‘কারও সোনা পানিতে পড়লে আমাদের ডাক পড়ে। গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে কাজ পাই। এখন আবার মোবাইল ফোনেও ডাক আসে। সোনার ভরি যখন আট হাজার টাকা, তখন থেকে এ কাজ করছি।’
দুই দশকের বেশি সময় এ কাজ করে এ পর্যন্ত ২০ ভরির বেশি সোনার গয়না খুঁজে দিয়েছেন ইউসুফ। তিন বছর আগে একবার চট্টগ্রামের চকরিয়া উপজেলার মগবাজার এলাকায় এক গৃহস্থের বাড়ির সামনের পুকুর থেকে এক ভরি ওজনের সোনার চেইন খুঁজে দিয়েছিলেন তিনি। মজুরির পরও তাঁরা খুশি হয়ে পাঁচ হাজার টাকা বকশিশ দিয়েছিলেন। তীব্র শীতেও কষ্ট সয়ে কাজ করেন ইউসুফ।
পুকুর ভরাট হওয়ায় মানুষের ঘরের ভেতর গোসল করার প্রবণতা বাড়ছে বলে জানান ইউসুফ আলী। তিনি বলেন, পুকুর না থাকায় আগের মতো সোনা হারায় না, কাজও মেলে না তেমন। কোনো মাসে ৮ হাজার আবার কোনো মাসে ১০ টাকা আয় হয় তাঁর।