
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আকর্ষণীয় নাম দিয়ে পেজ খুলে সস্তায় ‘চাঁদপুরের ইলিশ’ বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয় চক্রটি। সেই বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে ক্রেতারা অর্ডার করলে অগ্রিম টাকা চাওয়া হয়। এরপর ডেলিভারি কোড, ওটিপি বা সার্ভার সমস্যার অজুহাতে আরও টাকা দাবি করে চক্রটি। কয়েক দফায় টাকা নেওয়ার পর ক্রেতার নম্বর ব্লক করে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় প্রতারক চক্রটি।
এভাবে অনলাইনে ‘চাঁদপুরের ইলিশ’ বিক্রির নামে প্রতারণা করে আসা একটি চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে চাঁদপুর জেলা ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্তে চক্রটির মূল শিকড় নড়াইলে পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। সেখানে একের পর এক অভিযান চালিয়ে চক্রটির সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
সবশেষ গত রোববার নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় যৌথ অভিযান চালিয়ে চক্রটির চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন ফুরকান শেখ (২৫), চান মিয়া (২৫), রাতুল হোসেন (২৫) ও শহিদুল শেখ (২৩)। আজ মঙ্গলবার তাঁদের চাঁদপুরের আদালতে পাঠানো হয়। তাঁদের কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত ১০টি মুঠোফোন, ৪৬টি সিম কার্ড (২টি ভারতীয়) ও ৭৫ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।
এর আগে একই অভিযোগে নড়াইল থেকে পৃথক দুটি অভিযানে ২৬ আগস্ট পাঁচজন ও ২০ আগস্ট দুজনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাদিরা নুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনলাইনে চাঁদপুরের ইলিশের ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণার অনেক অভিযোগ আমরা পাচ্ছি। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্তে দেখা গেছে, চক্রটির মূল শিকড় নড়াইলে। এর আগেও আমরা সেখান থেকে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছি। পুরো চক্রটিকে নির্মূল করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।’
বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে কোনো ক্রেতা অর্ডার করার পর বিকাশ বা নগদে অগ্রিম টাকা চাওয়া হয়। এরপর ক্রেতারা টাকা পাঠালে ডেলিভারি কোড বা ওটিপি দেওয়ার কথা বলে কিংবা সার্ভার সমস্যার অজুহাতে আরও টাকা চাওয়া হতো। এভাবে কয়েক কিস্তিতে টাকা নেওয়ার পর ক্রেতার নম্বর ব্লক করে দিত চক্রটি।
পুলিশ ও ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চক্রটি ফেসবুকে ‘চাঁদপুর ইলিশ বাজার’ কিংবা ‘চাঁদপুর মাছওয়ালা’ ইত্যাদি আকর্ষণীয় নামে পেজ খুলত। এসব পেজে চাঁদপুরের তাজা ইলিশের এডিটেড ছবি ও ভিডিও এবং ভুয়া গ্রাহক রিভিউ ব্যবহার করা হতো। এরপর কম দামে ইলিশ বিক্রির বিজ্ঞাপন ফেসবুকে বুস্ট করা হতো।
ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জন করার জন্য চক্রটি অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ও চাঁদপুরের বিভিন্ন মৎস্যঘাটের ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স দেখাত। বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে কোনো ক্রেতা অর্ডার করার পর বিকাশ বা নগদে অগ্রিম টাকা চাওয়া হয়। এরপর ক্রেতারা টাকা পাঠালে ডেলিভারি কোড বা ওটিপি দেওয়ার কথা বলে কিংবা সার্ভার সমস্যার অজুহাতে আরও টাকা চাওয়া হতো। এভাবে কয়েক কিস্তিতে টাকা নেওয়ার পর ক্রেতার নম্বর ব্লক করে দিত চক্রটি।
অনলাইনে ইলিশ কেনা থেকে সাধারণ মানুষকে বিরত থাকার অনুরোধ করছি। চাঁদপুরের তাজা ইলিশ পেতে হলে ক্রেতাকে সরাসরি ঘাটে আসতে হবে। অনলাইনে কিনতে গেলেই প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।আবদুল বারি জমাদার, চাঁদপুর জেলা মৎস্য বণিক সমিতির সভাপতি
সম্প্রতি এতিমখানার শিশুদের ইলিশ খাওয়ানোর জন্য অনলাইনে আট কেজি ইলিশ অর্ডার করেন চট্টগ্রামের সংবাদকর্মী মীর মোহাম্মদ আসলাম। এ জন্য তিনি প্রবাসীদের পাঠানো টাকা ব্যবহার করেন। পরে ওটিপি ও সার্ভার সমস্যার অজুহাতে ধাপে ধাপে তাঁর কাছ থেকে ১৫ হাজার ৯৮০ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। কুমিল্লার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. বসিরূল আলম ভূঁইয়াও একই ধরনের প্রতারণার শিকার হন। ‘চাঁদপুর মাছওয়ালা’ নামের একটি পেজের মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে চার হাজার টাকা নেওয়া হয়। এসব ঘটনায় চাঁদপুরের পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
অনলাইন প্রতারণা ঠেকাতে চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিক্রেতাদের নিবন্ধনের উদ্যোগ নিলেও প্রতারণা থামছে না। চাঁদপুর জেলা মৎস্য বণিক সমিতির সভাপতি আবদুল বারি জমাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অনলাইনে ইলিশ কেনা থেকে সাধারণ মানুষকে বিরত থাকার অনুরোধ করছি। চাঁদপুরের তাজা ইলিশ পেতে হলে ক্রেতাকে সরাসরি ঘাটে আসতে হবে। অনলাইনে কিনতে গেলেই প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।’