গত এক বছরে মিরসরাইয়ে ৮২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার আবুতোরাব বাজারে নির্মাণসামগ্রীর দোকানে চাকরি করতেন সানি বড়ুয়া। বৃদ্ধ মা-বাবা, স্ত্রী ও ছোট এক মেয়েকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। গত ১৭ জানুয়ারি দুই বন্ধুর সঙ্গে মোটরসাইকেলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন তিনি। উপজেলার সুফিয়া রাস্তার মাথা এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তাঁর মোটরসাইকেলকে চাপা দেয় দ্রুতগতির যাত্রীবাহী একটি বাস। এ ঘটনায় মোটরসাইকেলে থাকা অন্য দুজনসহ ঘটনাস্থলে নিহত হন সনি বড়ুয়া। সড়ক দুর্ঘটনায় সংসারের হাল ধরা মানুষটির মৃত্যুতে সানির পরিবার বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে।
মিরসরাই উপজেলায় সনির পরিবারের মতো এমন অনেক পরিবারে এখন স্বজন হারানোর শোক। মহাসড়কের এই অংশে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত এক বছরে ৮২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার জোরারগঞ্জ ও কুমিরা হাইওয়ে থানা, বারইয়ারহাট ফায়ার সার্ভিস, মিরসরাই ফায়ার সার্ভিস ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব দুর্ঘটনায় ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৩৪ জন।
দুর্ঘটনায় ট্রাক-লরি ও মোটরসাইকেল
৮২টি সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি প্রায় ৫৪টি দুর্ঘটনার কারণ মালবাহী ট্রাক ও লরি। অর্থাৎ মোট দুর্ঘটনার ৬৫ দশমিক ৮৫ শতাংশের কারণ এসব ভারী যানবাহন। এর মধ্যে ২৫টি দুর্ঘটনা ছিল ট্রাক ও লরির সংঘর্ষ। এসব দুর্ঘটনায় ১৪ জন চালক ও সহকারী প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান উল্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে আরও ২৯টি। এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩ জন।
ভারী যানবাহনের পর প্রাণহানির দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে আছে মোটরসাইকেল। গত এক বছরে মিরসরাইয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ১১টি। এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ জন। সিএনজিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে অন্যান্য গাড়ির সংঘর্ষের দুটি ঘটনায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। যাত্রীবাহী বাসের চারটি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪ জন।
এ ছাড়া উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পথচারীরও মৃত্যু হয়েছে দুর্ঘটনায়। রাস্তা পারাপার বা হাঁটার সময় গত এক বছরে মিরসরাই এলাকায় ১০ জন পথচারী নিহত হয়েছেন।
যেসব কারণে দুর্ঘটনা
হাইওয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও যানবাহন চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিরসরাই উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দক্ষিণে বড়দারগারহাট ও উত্তরে ধুমঘাট সেতু পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার এলাকায় মূলত দুর্ঘটনা ঘটছে।
রাস্তার ত্রুটি, গর্ত, খানাখন্দ, চালকদের চোখে ঘুম, ইউটার্নে গাড়ি থামিয়ে রাখা, বেপরোয়া গতি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল ও ট্রাফিক আইন না–মানা, দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন জোরারগঞ্জ হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক বোরহান উদ্দিন।
বোরহান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই উপজেলা অংশের বড়তাকিয়া বাজার থেকে ধুমঘাট সেতু পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার এলাকায় নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, মহাসড়কে অনেক সময় বড় কাভার্ড ভ্যান, লরি অবৈধভাবে পার্কিং করে রাখা হয়। এতে দ্রুতগতিতে আসায় ট্রাক-লরি ওই সব গাড়িকে ধাক্কা দেওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব দুর্ঘটনায় ১৪ জন চালক ও সহকারীর মৃত্যু হয়েছে।
বারইয়ারহাট ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন প্রথম আলোকে বলেন, দুর্ঘটনার বড় একটি অংশই হয় মহাসড়কের ওপর থেমে থাকা গাড়ির পেছনে অন্য গাড়ির ধাক্কায়। বিশেষ করে গাড়ির যন্ত্রাংশের ত্রুটি মেরামতের সময় থামানো গাড়িগুলোকে পেছন থেকে আসা চলন্ত গাড়ি ধাক্কা দেয়। চালকের চোখে ঘুম থাকে বলে সামনের থেমে থাকা গাড়ি অনেক সময় তিনি দেখতে পান না।
৩১টি মামলা
গত এক বছরে মিরসরাইয়ে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় জোরারগঞ্জ ও কুমিরা হাইওয়ে থানায় ৩১টি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে জোরারগঞ্জ হাইওয়ে থানায় ২৫টি ও কুমিরা হাইওয়ে থানায় ৬টি মামলা হয়েছে।
আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১০৮ জন জোরারগঞ্জ হাইওয়ে থানা ও ২৬ জন কুমিরা হাইওয়ে থানার এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে জোরারগঞ্জ হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লা আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বৃষ্টির পানিতে সড়কে গর্ত তৈরি হওয়ায় অন্য সময়ের তুলনায় বর্ষাকালে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ে। চালকের চোখে ঘুমও দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে। আমরা চালকদের সচেতন করতে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত কাজ করি। আর সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার অবৈধ চলাচল বন্ধ করতে প্রতিদিন অভিযান চালিয়ে মাসে গড়ে ৬০টি মামলা দিচ্ছি।’