হাজারো ভক্তের অংশগ্রহণে খুলনার গোলকমণি পার্ক থেকে শুরু হয় রথযাত্রা। আজ বৃহস্পতিবার খুলনার শিববাড়ি মোড় এলাকায়
হাজারো ভক্তের অংশগ্রহণে খুলনার গোলকমণি পার্ক থেকে শুরু হয় রথযাত্রা। আজ বৃহস্পতিবার খুলনার শিববাড়ি মোড় এলাকায়

রথযাত্রায় হাজারো ভক্তের উচ্ছ্বাস, গ্রামীণ মেলায় রঙিন উৎসব

বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় অনুষ্ঠান শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার রথযাত্রায় অংশ নিয়ে উলুধ্বনি আর শঙ্খ-কাশর বাজিয়ে উৎসবে মেতে ওঠেন ভক্তরা। রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও গ্রামীণ মেলারও আয়োজন করা হয়।

নওগাঁয় শহরের কালীতলা এলাকার শ্রীশ্রী বুড়া কালীমাতা মন্দির কমিটির উদ্যোগে রথযাত্রা বের করা হয়। বুড়া কালীমাতা মন্দিরের সংলগ্ন কাঠহাটি মাঠ থেকে সকাল ১০টায় প্রথম টানের মধ্য দিয়ে রথযাত্রা উৎসবের শুরু হয়। ভক্তরা রশি ধরে রথ টেনে এ পুণ্য তীর্থে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন। রথটি বুড়া কালীমাতা মন্দির প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। রথযাত্রায় হাজার হাজার নারী-পুরুষের সমাগম হয়। ২৪ জুলাই উল্টো টানের মধ্য দিয়ে ৯ দিনব্যাপী এই রথযাত্রা উৎসব শেষ হবে। ৯ দিনব্যাপী রথযাত্রা উৎসব উপলক্ষে মন্দির কমিটি নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এসব অনুষ্ঠানের মধ্যে হরিনাম সংকীর্তন, বিশ্বশান্তি ও মঙ্গল কামনায় অগ্নিহোত্র যজ্ঞ, মহাপ্রসাদ বিতরণ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠান থাকবে। রথযাত্রা উপলক্ষে কালীতলা মন্দিরসংলগ্ন এলাকায় গ্রামীণ মেলা বসেছে। মেলায় বিভিন্ন মিষ্টান্ন দ্রব্য, শিশুদের খেলনাসহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বিক্রেতারা।

রথযাত্রার উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নওগাঁ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রহমান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বুড়া কালীমাতা মন্দির কমিটির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা চন্দন, সহসভাপতি শিশির কুমার দাস, সাধারণ সম্পাদক অখিল চন্দ্র ঘোষ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নেপাল চন্দ্র সাহা, আখড়াবাড়ি মন্দির কমিটির দপ্তর সম্পাদক সুবল চন্দ্র মণ্ডল প্রমুখ।

এ ছাড়া নওগাঁর আত্রাইয়েও হাজারো নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব জগন্নাথদেবের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকালে উপজেলার ভবানীপুর বাজারসংলগ্ন জগন্নাথ মন্দিরের আয়োজনে এ রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ভবানীপুর জগন্নাথ মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে রথযাত্রা বের হয়। আজ বৃহস্পতিবার সকালে ভবানীপুর জগন্নাথ মন্দির প্রাঙ্গণে

শ্রীমঙ্গল

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্‌যাপিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। বৃহস্পতিবার বিকেলে হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থীর অংশগ্রহণে শ্রীশ্রী জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে সুসজ্জিত রথে আরোহণ করিয়ে শ্রীমঙ্গল শহর প্রদক্ষিণ করা হয়। এ উপলক্ষে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের আখড়া এবং আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) পৃথকভাবে দুটি রথযাত্রার আয়োজন করে। ভক্তরা ভক্তিগীতি, হরিনাম সংকীর্তন ও ধর্মীয় স্লোগানের মধ্য দিয়ে রথের দড়ি টেনে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। এতে শহরজুড়ে সৃষ্টি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ।

রথযাত্রা উপলক্ষে শহরের হবিগঞ্জ সড়কে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের আখড়ার সামনে রাস্তার দুই পাশে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মেলা। মেলায় মাটির তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী, খেলনা, ফলমূল, মিষ্টান্নসহ নানা ধরনের খাবারের দোকান বসেছে। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের পদচারণে মেলা প্রাঙ্গণ ছিল প্রাণচঞ্চল।

রাঙামাটি

শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের এই জনপদে বইছে উৎসবের আমেজ। বৃহস্পতিবার  সকালে মঙ্গলারতি, ভাগবত পাঠ, বিশেষ পূজা ও কীর্তনের মধ্য দিয়ে রথযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। দুপুরের পর থেকেই শহরের সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দর্শনার্থীরা মূল উৎসব প্রাঙ্গণে সমবেত হতে শুরু করেন। বর্ণিল সাজে সজ্জিত বিশাল রথ টেনে নেওয়ার জন্য হাজারো ভক্তের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।

​এর আগে দুপুরে শ্রীশ্রী রাধা রাসবিহারী ধাম ও গৌরনিতাই আশ্রমে আলোচনা সভা ও বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে বক্তারা রথযাত্রার তাৎপর্য ও সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরেন। আলোচনা সভা শেষে ভক্তরা সমবেত কণ্ঠে হরিনাম সংকীর্তন ও উলুধ্বনি দিয়ে ঐতিহ্যবাহী রথের রশি টেনে এই পুণ্যযাত্রার সূচনা করেন।

রথ টানছেন ভক্তরা। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজশাহী নগরের সাহেব বাজার এলাকায়

মানিকগঞ্জ

মানিকগঞ্জ শহরে কালীবাড়ি এলাকায় শ্রীশ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ি মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে বর্ণাঢ্য রথযাত্রা বের হয়। এতে সনাতন ধর্মাবলম্বী হাজারো নারী-পুরুষ ভক্ত অংশ নেন। দুপুরে রথযাত্রার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় মন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, ‘মানিকগঞ্জের মানুষের মধ্যে ধর্ম–বর্ণের কোনো ভেদাভেদ নেই। এখানে আমরা মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিষ্টান সবাই মিলেমিশে বসবাস করছি। মানিকগঞ্জের মতো এত সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের জেলা হয়তো খুব কমই আছে।’

রথযাত্রা উপলক্ষে শহরের বিভিন্ন সড়কের পাশে সাত দিনের অস্থায়ী মেলা বসেছে। ২৪ জুলাই বিকেলে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের উল্টো রথযাত্রার মধ্য দিয়ে এ বছরের রথযাত্রা উৎসবের সমাপ্তি হবে।

শেরপুর

শেরপুরে সকালে শহরের গোপাল জিউর মন্দির থেকে রথযাত্রা শুরু হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা রশি ধরে রথ টেনে শহরের নয়আনী বাজার এলাকার কালীমাতার মন্দিরে নিয়ে যান। পরে সেখান থেকে রথটি আবার গোপাল জিউর মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়।

বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন ফ্রন্ট শেরপুর জেলা শাখার সহযোগিতায় গোপাল জিউর মন্দির পরিচালনা কমিটি কর্মসূচির আয়োজন করে। এতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

উৎসব উপলক্ষে গৃদানারায়ণপুর এলাকার নরসিংহ জিউর মন্দির ও গোপাল জিউর মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা ও হরিনাম সংকীর্তনের আয়োজন করা হয়। নয়আনী বাজার এলাকার কালীমাতার মন্দির প্রাঙ্গণে বসে দিনব্যাপী মেলা।

বগুড়ার শেরপুরে ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রার মেলায় হরেক রকম খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে শহরের শেরপুর সরকারি ডি জে মডেল হাইস্কুল খেলার মাঠে

বগুড়ার শেরপুর

বগুড়ার শেরপুরে বেলা সোয়া একটায় শহরের জগন্নাথপাড়া মহল্লায় শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের মন্দির কমিটি রথযাত্রা উৎসবের আয়োজন করে। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কয়েক হাজার নারী–পুরুষ ভক্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

মন্দির প্রাঙ্গণে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মন্দির কমিটির সভাপতি সমীর কুমার কুণ্ডু। এতে অতিথি ছিলেন বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা ও শেরপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র জানে আলম খোকা, উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, শেরপুর পৌর বিএনপির সভাপতি স্বাধীন কুমার কুণ্ডু ও সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ।

রথযাত্রা উপলক্ষে মন্দিরের সামনে ও পাশে শেরপুর সরকারি ডি জে মডেল হাইস্কুল খেলার মাঠে মেলা বসে। মেলার প্রধান আকর্ষণ হরেক রকমের নাড়ুসহ মৌসুমি ফল।

স্থানীয় ব্যবসায়ী সঞ্জীব কুণ্ডু ও শান্ত সান্যাল বলেন, শেরপুরে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রার উৎসব চলে আট দিনব্যাপী। উৎসবকে ঘিরে এই মেলা বসে দুই দিন। প্রথম মেলা আজ বৃহস্পতিবার। উৎসবের শেষ দিনেও একই স্থানে বসবে এই মেলা।

দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, মেলায় হরেক রকমের নাড়ু্র পাশাপাশি রয়েছে মৌসুমি ফলের দোকান। এ ছাড়া সনাতন ধর্মীয় গ্রন্থ বিক্রির পসরা বসেছে। রয়েছে চুড়ি, মালা ও ফিতার দোকান। মেলায় আসা লোকজন এসব দোকান থেকে কেনাকাটা করছেন।

মেলায় কথা হয় মুক্তির রানীর (৪০) সঙ্গে। তাঁর বাড়ি উপজেলার বিশালপুর ইউনিয়নে। তিনি বলেন, এই রথযাত্রা উৎসবে তিনি পাঁচ বছর ধরে আসছেন। শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের মন্দিরে পূজা অর্চনা শেষে মেলার বিভিন্ন ধরনের নাড়ু কিনে বাড়ি ফিরবেন।

শেরপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জয়নুল আবেদীন বলেন, রথযাত্রার উৎসব ঘিরে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এই মেলা চত্বরে তাঁরা নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। মেলা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তায় থাকবে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন প্রতিনিধি, নওগাঁ, শেরপুর, রাঙামাটি, মানিকগঞ্জ; শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার ও শেরপুর, বগুড়া]