নৌকাডুবিতে পদ্মায় নিখোঁজ জাহেরা বেগমের স্বামী–সন্তান। থামছেই না তাঁর আহাজারি। বুধবার সকালে রাজশাহী নগরের কাটাখালি থানার শ্যামপুর বালুঘাট এলাকায়
নৌকাডুবিতে পদ্মায় নিখোঁজ জাহেরা বেগমের স্বামী–সন্তান। থামছেই না তাঁর আহাজারি। বুধবার সকালে রাজশাহী নগরের কাটাখালি থানার শ্যামপুর বালুঘাট এলাকায়

পদ্মায় ডুবল জাহেরার ঋণের নৌকা, নিজে বাঁচলেও স্বামী-সন্তান নিখোঁজ

ঋণ নিয়ে নৌকা বানিয়েছিলেন জাহেরা বেগমের স্বামী। গতকাল মঙ্গলবার রাজশাহীর পদ্মা নদীতে তাঁর চোখের সামনেই নৌকাসহ তলিয়ে গেছেন স্বামী ও সন্তান। নৌকাতে জাহেরাও ছিলেন। সাঁতার কেটে তিনি তীরে উঠতে পারলেও তাঁর আহাজারি থামছে না। এই বাঁচা যেন সহ্য হচ্ছে না তাঁর। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জাহেরা বলছিলেন, ‘আমিই বাঁইচা গেনু, আমার স্বামী আর ব্যাটাকে হারানু। গাঙে ক্যানে আমাক নিল না?’

পদ্মা নদীর চর থেকে ঝাউগাছ কেটে নিয়ে এসে ব্যবসা করার জন্য জাহেরা স্বামী কাওসার আলী কিস্তির ওপর ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নিয়ে নৌকা বানিয়েছিলেন। সপ্তাহে আড়াই হাজার টাকা ঋণের কিস্তি দিতে হয়। এখন নৌকা, স্বামী-সন্তান সব হারিয়ে গেল, শুধু থেকে গেল ঋণের বোঝা। আজ বুধবার সকালে জাহেরা বেগম এ কথা বলেই বিলাপ করছিলেন।

আমার স্বামী চলে গেল, শ্বশুরও চলে গেল। উপার্জন করার কেউ থাকল না। আমরা এখন চলব কী করে? সরকার যেন আমাদের দিকে একটু সুনজর দেয়। আমরা বাঁচতে চাই।
সায়েরা খাতুন, নিখোঁজ জিয়ারুল ইসলামের স্ত্রী

সারা জীবন পদ্মা নদীর পাড়েই বাস করেছেন জাহেরা বেগম। নদীকে কেন্দ্র করেই তাঁর জীবন-জীবিকা। সেই নদী পাড়ি দিতে গিয়ে এর আগে তিনবার মৃত্যুর মুখ থেকে ঘুরে এসেছেন জাহেরা। নৌকাডুবির পর প্রতিবারই সাঁতরে পাড়ে এসেছেন। গতকাল দুপুরেও স্বামী–সন্তানের সঙ্গে নৌকাতেই ছিলেন জাহেরা। এবারও তিনি সাঁতরে তীরে উঠেছেন। কিন্তু উঠে আসতে পারেননি তাঁর স্বামী কাওসার আলী (৬০) ও ছেলে জিয়ারুল ইসলাম (৩০)।

জাহেরার বাড়ি রাজশাহীর কাটাখালী থানার শ্যামপুর বালুঘাট এলাকায়। বাড়ির সামনে দিয়েই বয়ে গেছে পদ্মা। আগে তাঁদের বাড়ি ছিল নদীর ওপারে ভারতীয় সীমান্ত লাগোয়া চর খিদিরপুরে। সেই বাড়ি নদীতে চলে গেলে তাঁরা এপারে চলে আসেন বছর দশেক আগে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পানের বরজে ঝাউগাছের খুব কদর। তাই ওই এলাকার নদীপাড়ের মানুষ পদ্মার চর থেকে ঝাউগাছ কেটে এনে চারঘাটে বিক্রি করেন। এই কাজের জন্য জাহেরার স্বামী কাওসার আলী ঋণ করে এবার একটি নৌকা বানিয়েছিলেন। এ নৌকায় পাড়ার কয়েকজনকে নিয়ে ঝাউগাছ কাটতে যেতেন কাওসার। তাঁদের সঙ্গে যেতেন কাওসারের স্ত্রী জাহেরা বেগম ও ছেলে জিয়ারুল ইসলামও।

মঙ্গলবার দুপুরে নদী ছিল উত্তাল। ঝাউগাছ নিয়ে আসার পথে নৌকার নিয়ন্ত্রণ হারান কাওসার আলী। রাজশাহীর বড়কুঠির সামনে মাঝনদীতে নৌকাটি ডুবে যায়। এ সময় জাহেরা বেগমসহ নৌকার ছয় যাত্রী নদীতে সাঁতার কাটতে থাকেন। অন্য একটি নৌকা গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে। কিন্তু পানিতে তলিয়ে যান মাঝি কাওসার আর ও তাঁর ছেলে জিয়ারুল। আজ দুপুর পর্যন্ত তাঁদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের রাজশাহী সদর স্টেশনের উপপরিচালক মনজিল হক বলেন, আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত বাবা–ছেলের লাশের সন্ধান পাওয়া যায়নি। রাজশাহী থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে নজর রাখা হচ্ছে। কোথাও লাশ ভেসে উঠলেই দ্রুত সময়ের মধ্যে উদ্ধার করা হবে।

স্বামী ও সন্তানের লাশের আশায় পদ্মা নদীর পাড়ে বসে থেকে আহাজারি করছেন জাহেরা বেগম

‘আমরা বাঁচতে চাই’

সকালে জাহেরা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জিয়ারুলের স্ত্রী সায়েরা খাতুনকে নিয়ে বসে আছেন স্বজনেরা। একসঙ্গে বাবা আর দাদাকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছে সায়েরার ছেলে তামিম (১১) ও মেয়ে তাসমিরা (৭)। কাঁদতে কাঁদতে সায়েরা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী চলে গেল, শ্বশুরও চলে গেল। উপার্জন করার কেউ থাকল না। আমরা এখন চলব কী করে? সরকার যেন আমাদের দিকে একটু সুনজর দেয়। আমরা বাঁচতে চাই।’

সায়েরার আকুতি, তাঁর স্বামী-শ্বশুরের লাশটি অন্তত উদ্ধার করে যেন তাঁদের দেওয়া হয়। শেষবারের মতো একনজর স্বামীর মুখ দেখে গোসল করিয়ে তাঁকে কবরস্থ করতে চান।

স্বামী-সন্তানকে চোখের সামনে ভেসে যেতে দেখেছেন জাহেরা বেগম। তার পর থেকেই আহাজারি করছেন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর গলা বসে গেছে। তবু কান্না থামছে না। বাঁধের ওপর বসে নদীর দিকে তাকিয়েই চোখের পানি ফেলছেন। জাহেরা জানান, ৫৫ বছরের জীবনে তিনি এর আগেও তিনবার নৌকাডুবিতে পড়েছিলেন। সাঁতার জানেন বলে তিনি বেঁচে ফিরেছেন। নিজ চোখে দেখেছেন স্বামী-সন্তানের ডুবে যাওয়া। জাহেরা বলেন, ‘অ্যার আগেও আমি তিনবার নৌকায় ডুব্যাছি। একবার ডুবে মরতে মরতে বাঁইচাছি। আমিই বাঁচা গেনু, আমার স্বামী আর ব্যাটাকে হারানু।’

জাহেরা জানান, বছরখানেক আগেই একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা কিস্তি নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকা করেছিলেন তাঁর স্বামী। এখন প্রতি সপ্তাহে আড়াই হাজার টাকা কিস্তি লাগে। ডুবে গিয়ে নৌকা ভেসে গেছে। ভেসে গেছেন স্বামী-সন্তানও। তিনি এখন কীভাবে কিস্তি শোধ করবেন, কীভাবে সংসার চলবে, তা ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছেন না।

জাহেরা বেগম নদীপাড়ে বসেই বারবার দুই হাত তুলছেন। দ্রুতই যেন তাঁর স্বামী-সন্তানের লাশ পাওয়া যায়, সেই দোয়া করছেন। বলছেন, ‘গাঙে ক্যানে আমাক নিল না? আমাক রাইখে ক্যান আমার স্বামী-ব্যাটাক নিল? ছেইলির বউকে লিয়ি আমার সংসার এখন চইলবে কী কইরি?’