ঢাকার মিরপুরে আলোচিত শিশু হত্যার ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি আগামী এক মাসের মধ্যে নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ শনিবার বিকেলে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার নজরুল একাডেমি মাঠে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘ঢাকার মিরপুরে একটি নিষ্পাপ মেয়ের নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের মানবিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয়ের চূড়ান্ত প্রমাণ মিলেছে। এ বিষয়ে একটি কথা আজকের এ অনুষ্ঠানে আমি পরিষ্কারভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। এ ধরনের শিশু নির্যাতন বা নারী নির্যাতন বর্তমান সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না। বর্তমান সরকার শিশুটির হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি আগামী এক মাসের মধ্যে নিশ্চিত করবে এবং সেই সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। যাতে করে ভবিষ্যতে আর কোনো ব্যক্তি, মানুষ এভাবে শিশু বা নারী নির্যাতন করার সাহস না পায়।’
একটি নিরাপদ মানবিক রাষ্ট্র এবং সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতেই হবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের জাতীয় জীবনে পুনরায় বাংলাদেশের আবহমানকালের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পুনর্জীবন ঘটাতে হবে। এ ক্ষেত্রেও কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন এবং কর্ম আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক।’
নিজের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘কবি নজরুলের জীবন এবং কর্ম বিশ্বসাহিত্য দরবারে আরও বেশি ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর জীবনবোধ, দর্শন প্রজন্মের পর প্রজন্মে পৌঁছে দিতে হবে। এরই অংশ হিসেবে আমাদের জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালকে নজরুল সিটি হিসেবে ঘোষণা করা যায় কি না, এ ব্যাপারে সম্ভাবনা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য আমি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং পর্যটন বিভাগের প্রতি আহ্বান জানাব। বাংলাদেশ ও কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিভাজ্য সত্তা। তিনি আমাদের জাতীয় সত্তার সার্থক প্রতিনিধি। আমাদের জাতীয় চেতনার প্রতীক, আমাদের জাতীয়তাবাদের প্রতীক।’
নজরুল জন্মজয়ন্তী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, স্বাগত বক্তব্য দেন ত্রিশালের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান ও স্মারক বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর। অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কবিপৌত্রী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান খিলখিল কাজী, ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মো. লতিফুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান প্রমুখ। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে আজ দুপুরে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় ধরার খাল পুনঃখননের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালের ধরার খাল খনন করেছিলেন। বাবার খনন করা খালটি ৪৭ বছর পর পুনঃখননের উদ্বোধন করেছেন তারেক রহমান।
আজ বেলা ২টা ২১ মিনিটে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ত্রিশালের ওই খালের পাড়ে পৌঁছে খননকাজের উদ্বোধন করেন। এ সময় খালপাড়ে একটি তালগাছের চারা রোপণ করেন তিনি। খাল পুনঃখনন উদ্বোধন শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেকোনো অন্যায়কারীকে শাস্তি দিতে হলে, তার বিচার করতে হলে সরকারের কতগুলো নিয়মকানুন আছে। এখন আমরা খেয়াল করছি, গত কয়েক দিন ধরে কিছুসংখ্যক মানুষ একটা পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করছে, রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিচ্ছে, যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে, আগুন ধরাচ্ছে ও উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। এ কাজগুলোর মাধ্যমে তারা কি আইনের শাসনকে বাধাগ্রস্ত করছে না? আইনকে আইনের মতো কি চলতে দিচ্ছে?’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনো দেশে এমন কয়েকটি দুঃখজনক অন্যায় ঘটনা ঘটেছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘সেই অন্যায় যখন ঘটেছে, আমি নিজেই সেই সব বাচ্চার মায়েদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। আমাদের দলের চিকিৎসকেরা গিয়ে চিকিৎসা দিয়েছে, আইনজীবীরা গিয়ে সেই আইনি সহায়তা করেছিল। কিন্তু আজকে যে ব্যক্তিরা হইচই করছে, রাস্তা অবরোধ করছে, বড় বড় কথা বলছে, সেদিন কিন্তু তাদের আমরা মাঠে দেখিনি। সেদিন কিন্তু তাদের আমরা দেখিনি, যে তারা অবরোধ করেছে। তাহলে কি আমরা ধরে নেব বাংলাদেশের জনগণ বিএনপিকে ভোট দিয়ে সরকার গঠন করতে দিয়েছে বলে তাদের জ্বালা হচ্ছে এবং এই জ্বালার কারণেই তারা এসব কর্মকাণ্ড করছে?’
যারা দেশে এমন অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, তাদের ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যদি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, এই খাল কাটা বন্ধ হয়ে যাবে সারা বাংলাদেশে। ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে? ফ্যামিলি কার্ডের বিতরণ বন্ধ হয়ে যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে? কৃষক কার্ডের বিতরণ বন্ধ হয়ে যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে? তারা যদি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, তাহলে ইমাম সাহেবদের, মুয়াজ্জিন সাহেবদের, খতিব সাহেবদের অন্যান্য ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী দেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের এই অরাজক পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে খেটে খাওয়া মানুষ। সে জন্যই আমাদের সতর্ক হতে হবে।’
প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম ও ব্যাগ দেওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে গ্রামাঞ্চলে প্রাইমারি স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চাদের নতুন স্কুলের পোশাক দেব, বই খাতা নেওয়ার জন্য নতুন স্কুল ব্যাগ দেব। সেটির কাজ চলছে। ইনশা আল্লাহ, জুলাই মাস থেকে সমগ্র বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমে সব প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের কাছে আমরা নতুন কাপড় ও নতুন স্কুলব্যাগ পৌঁছে দেব।’
পুনঃখনন শুরু হওয়া খালটির বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনাদের অনেকেরই খেয়াল আছে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আজ থেকে প্রায় ৪৫ বছর আগে এই খালটি খনন করতে এসেছিলেন। এই খালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এলাকার মানুষের অনেক সমস্যা হয়েছে, বিশেষ করে কৃষকদের। এই খালটি খনন করে খনন সম্পন্ন হলে এই এলাকার প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কৃষক উপকৃত হবেন। প্রায় ২০ হাজার মানুষ উপকৃত হবেন। সমগ্র ময়মনসিংহ জেলায় প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার খাল রয়েছে, যেগুলো খনন বা পুনঃখনন করা প্রয়োজন।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম রাশেদুজ্জামান মিল্লাত, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ, স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান, সদর আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, মুক্তাগাছা আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জাকির হোসেন, গফরগাঁও আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান, জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান প্রমুখ।