রিকশা চালিয়ে নিজের পড়ার খরচ জোগান মনিরুল

মোল্লা মো. মনিরুল ইসলাম রিকশা চালিয়ে পড়ার খরচ জোগান
ছবি: প্রথম আলো

শার্ট-প্যান্ট পরে পরিপাটি হয়ে যশোর শহরে রিকশা চালান এক তরুণ। নাম মোল্লা মো. মনিরুল ইসলাম। তিনি যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজে ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। নিজের বিষয় ও চাকরির পড়াশোনার সময়টুকু বাদে বাকি সময় তিনি ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান। তাতে তাঁর যে আয় হয়, তা দিয়েই নিজের লেখাপড়া ও থাকা-খাওয়ার খরচ চালান তিনি।

মনিরুল যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার সাইটখালী গ্রামের ইউসুফ আলীর ছেলে। আট ভাই-বোনের সংসারে তিনি সবার ছোট। অভাব অনটনের সংসারে তাঁর বাবা রোগে-শোকে ভুগে বছর তিনেক আগে মারা যান। বাবার পক্ষে তাঁর লেখাপড়ার খরচ চালানো সম্ভব ছিল না। তিনি খুলনা শহরের একটি এতিমখানায় থেকে লেখাপড়া করেছেন। মাস দুয়েক আগে তাঁর মা হৃদ্‌রোগে মারা যান।

নিজের খরচ চালাতে খুলনা শহরে থাকার সময় মনিরুল রিকশা চালাতে শুরু করেন। যশোরে পড়তে এসেও কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, প্রথম দিকে বন্ধুদের কাছে নিজের পেশা গোপন করতে মুখ বেঁধে রিকশা চালাতেন। এখন তাঁর রিকশা চালানোর বিষয়টি কলেজের শিক্ষক ও বন্ধুরা জানেন। তবে তাদের অনেকেই বিষয়টি ভালোভাবে নেন না। তাঁর পরিবারের লোকজনও তাঁর রিকশা চালানোর বিষয়টি ভালোভাবে নেন না।

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাইদের মধ্যে একজন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় শুধু ফরম পূরণের টাকাটা দিয়েছেন। অন্যরা কেউ আমাকে টাকা-পয়সা দিয়ে কোনো সহযোগিতা করেন না। আমার লেখাপড়া ও নিজের খরচ চালানোর মতো একটি কাজের খুব দরকার ছিল। তেমন কোনো কাজ পাইনি। তাই রিকশা চালাতে শুরু করি। ছোটবেলায় পাইলট হওয়ার শখ ছিল। তাই রিকশাটাকেই উড়োজাহাজ ভেবে চালাই। এ জন্য অনেকে আমাকে ‘পাগল-ছাগল’বলে অপমান করেন। কিন্তু টাকা দিয়ে তো কেউ কোনো সহযোগিতা করে না! এ জন্য আমি তাদের কথা কানে নিই না।’

ভাড়ায় রিকশা চালিয়ে টাকা জমিয়ে ৭৫ হাজার টাকা দিয়ে মনিরুল বর্তমান রিকশাটি কিনেছেন বলে জানালেন। তিনি বলেন, এই রিকশা নিয়ে তিনি বিপাকে পড়েছেন। কোনো ছাত্রাবাসে তাঁকে কেউ থাকার জায়গা দিচ্ছে না। কারণ ছাত্রাবাসে রিকশা রাখার জায়গা নেই। কলেজ ক্যাম্পাসের শহীদ আসাদ হল ছাত্রাবাসে থাকার জায়গা হলেও রিকশা রাখতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে প্রতি রাতে গ্যারেজে রিকশা রাখতে ৫০ টাকার বেশি ভাড়া দিতে হয়।

মনিরুল ইসলাম আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘রিকশা চালানো খুব কষ্টের কাজ। তার চেয়ে বেশি কষ্ট দেয়ে সামাজিকভাবে মানুষের আপত্তিকর মন্তব্য ও বন্ধুদের অবজ্ঞা। কিন্তু আমার স্বপ্ন অনেক বড়। বিসিএস ক্যাডার হতে চাই। এ জন্য কোচিং করছি।’গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ লেখার প্রতি আগ্রহ আছে জানিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা ছাপা হয়েছে।

যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ছোলজার রহমান বলেন, ‘মনিরুল ইসলাম এম এম কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। ব্যক্তিগতভাবেই আমি তাঁকে চিনি। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় রিকশা চালিয়ে তাঁকে লেখাপড়া ও থাকা-খাওয়ার খরচ জোগাতে হয়। অনেক সংগ্রাম করে তাঁকে টিকে থাকতে হচ্ছে।’