পাহাড়ধসের আশঙ্কা ছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছিল। প্রশাসন জানত, টানা ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবু ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে মানুষকে আগেভাগে সরানো যায়নি।
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে চার জেলায় পাহাড়ধসে ১৪ শিশুসহ অন্তত ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের প্রায় সবাই পাহাড়ের গা ঘেঁষে বা ঢালে গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে বাস করতেন।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে, ১৯ জনের। তাঁদের ১৩ জনই রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা। বান্দরবানে মারা গেছেন পাঁচজন, চট্টগ্রামে চার এবং রাঙামাটিতে একজন।
প্রশাসনের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্যোগ মোকাবিলা শুধু বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর সতর্কবার্তা প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে আগেভাগে সরিয়ে নেওয়া, পুনর্বাসন, পাহাড় সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিই প্রাণহানি কমানোর মূল উপায়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি (সংখ্যাতিরিক্ত) অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, প্রশাসন শুধু দুর্ঘটনার সময় সক্রিয় হয়। বৃষ্টি শুরু হলে মাইকিং করে মানুষকে সরে যেতে বলা হয়। কিন্তু শুধু মাইকিং করে মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব নয়। এটি কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না; বরং বৃষ্টি শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরানো, পুনর্বাসন এবং পাহাড়কে নিরাপদ করার কাজ শেষ করতে হবে।
প্রশাসনের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্যোগ মোকাবিলা শুধু বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর সতর্কবার্তা প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে আগেভাগে সরিয়ে নেওয়া, পুনর্বাসন, পাহাড় সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিই প্রাণহানি কমানোর মূল উপায়।
এবারের পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে। এ জেলায় নিহত ১৯ জনের মধ্যে ১৩ জনই রোহিঙ্গাশিবিরের বাসিন্দা। গত ৬ বছরে শিবিরে পাহাড়ধসে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়াল ৩৯।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে ১৪ লাখের বেশি নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছেন। গত দেড় বছরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিপীড়নের মুখে আরও প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। নতুন আসা অনেক পরিবার পাহাড় কেটে বা ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসতি গড়েন।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, ৪ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ৯৫টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৪ হাজার ৩০৭ জন গৃহহীন হয়েছে। বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও ২৬ হাজার ১১৯ জন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের প্রায় ৮০ শতাংশ ঘরই পাহাড়ের ওপর, ঢালে বা পাদদেশে নির্মিত। এক থেকে দেড় লাখ মানুষ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন। তাঁদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। এবার যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের অধিকাংশই নতুন করে আসা রোহিঙ্গা।
আবহাওয়া অধিদপ্তর গত শনিবার থেকেই দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছিল। এরপর টানা বৃষ্টিতে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১ হাজার ১৬৯ মিলিমিটার এবং কক্সবাজারে ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, এত অল্প সময়ে এত বেশি বৃষ্টি বিরল।
তবে এই বৃষ্টির আগেই ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের চিহ্নিত করে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিতে বড় ঘাটতি ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ঠিক কত মানুষ বসবাস করছেন, তার কোনো হালনাগাদ জরিপ নেই।
বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম নগরের ১১টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করত ৬৬৬টি পরিবার। বর্তমানে ২৬টি পাহাড়ে এ ধরনের বসতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫৫৫। বিভিন্ন সংগঠনের ধারণা, ২০২৩ সালের সর্বশেষ জরিপের পরও নতুন করে আরও বসতি গড়ে উঠেছে।
চট্টগ্রামের অবস্থাও প্রায় একই। জেলা প্রশাসনের হিসাবে, নগরের ২৬টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বা অবৈধ বসতি রয়েছে ৬ হাজার ৫৫৫টি। তবে এ তথ্য তিন বছর আগের। পরিবেশবিষয়ক সংগঠনগুলোর ধারণা, এ সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি আরও বেড়েছে।
বান্দরবান জেলা প্রশাসনের হিসাবে, এ জেলায় পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে ১ হাজার ৪৬৮টি পরিবার। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এস এম হাসান বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নিয়মিত প্রচার চালানো হচ্ছে। এরপরও কেউ না সরলে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাঁদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সমস্যার স্থায়ী সমাধান হলো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে অন্যত্র পুনর্বাসন করা।
চট্টগ্রামে পাহাড়ধস নতুন কোনো দুর্যোগ নয়। ২০০৭ সালের ১১ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৭ জনের মৃত্যুর পর গঠিত তদন্ত কমিটি ৩৬ দফা সুপারিশ করেছিল। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে মানুষকে সরিয়ে পুনর্বাসন, পাহাড় কাটা বন্ধ, পাহাড়ের ঢালে নতুন বসতি ঠেকানো, ন্যাড়া পাহাড়ে বনায়ন এবং পাহাড়ের মালিক সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছিল।
এর এক দশক পর ২০১৭ সালের জুনে রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে আরও ১৬৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। দ্বিতীয় দফার তদন্ত কমিটিও প্রায় একই ধরনের ৩৫ দফা সুপারিশ দেয়। অর্থাৎ ১০ বছরের ব্যবধানে দুই দফা বড় বিপর্যয়ের পরও সমস্যার ধরন বদলায়নি, সমাধানের সুপারিশও ছিল প্রায় একই।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম নগরের ১১টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করত ৬৬৬টি পরিবার। বর্তমানে ২৬টি পাহাড়ে এ ধরনের বসতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫৫৫। বিভিন্ন সংগঠনের ধারণা, ২০২৩ সালের সর্বশেষ জরিপের পরও নতুন করে আরও বসতি গড়ে উঠেছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, প্রয়োজনে মানুষকে জোর করেও নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়। তবে অনেকেই পরে আবার নিজ বাড়িতে ফিরে যান। তাঁর ভাষ্য, পাহাড়ের অবৈধ বসতির পেছনে বিভিন্ন মহলের ছত্রচ্ছায়া রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে উচ্ছেদ অভিযানও বাধাগ্রস্ত হয়। তাঁরা বছরজুড়ে পাহাড় ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড়ধসের জন্য শুধু অতিবৃষ্টি দায়ী নয়। বৃষ্টি কেবল শেষ ধাক্কাটি দেয়। ঝুঁকি তৈরি হয় বছরের পর বছর ধরে। পাহাড় কেটে ঢালের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করা, বন উজাড়, পাহাড়ের গা ঘেঁষে বসতি গড়ে তোলা এবং পানিনিষ্কাশনের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে পাহাড় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এরপর টানা বৃষ্টিতে মাটির ভেতরে পানি ঢুকে মাটির কণাগুলোর বন্ধন আলগা করে দেয়। তখন ঢালের মাটি নিজের ওজন আর ধরে রাখতে পারে না। একপর্যায়ে পুরো মাটির স্তর নিচে নেমে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি শুধু আশ্রয়কেন্দ্র খোলা বা সতর্কবার্তা প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের হালনাগাদ তালিকা, আগাম সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা, নিরাপদ পুনর্বাসন, পাহাড় সংরক্ষণ এবং নতুন করে অবৈধ বসতি গড়ে ওঠা ঠেকাতে সারা বছর সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
সরকারের হাতে আইন, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার (এসওডি)—সবই আছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগাম সতর্কবার্তাও ছিল। তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের আগে থেকেই সরিয়ে নেওয়া গেল না কেন?দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর একই ধরনের প্রাণহানির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো, পাহাড়ধসকে এখনো মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্ষা শুরু হলে প্রশাসন সতর্কতামূলক তৎপরতা বাড়ায়। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের চিহ্নিত করা, পুনর্বাসন, পাহাড়ে নতুন বসতি ঠেকানো কিংবা সারা বছর পাহাড় ব্যবস্থাপনার মতো দীর্ঘমেয়াদি কাজ আর এগোয় না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের হাতে আইন, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার (এসওডি)—সবই আছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগাম সতর্কবার্তাও ছিল। তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের আগে থেকেই সরিয়ে নেওয়া গেল না কেন?
গওহার নঈম ওয়ারার ভাষ্য, অতীতে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে মানুষদের জোর করে সরিয়ে নিয়েছিলেন। প্রশাসন চাইলে সেটি সম্ভব। এবার তা না হওয়ার পেছনে মাঠ প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে একধরনের অনিশ্চয়তা ও ভীতি কাজ করেছে বলে তাঁর ধারণা। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার চিহ্নিত করে তাদের সরিয়ে নেওয়া এবং পরে নিরাপদভাবে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা জোরদারের পরামর্শ দেন তিনি।