‘প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে : ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যালঘু অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপ। বুধবার সকালে রংপুরের আরডিআরএস বাংলাদেশের বেগম রোকেয়া মিলনায়তনে
‘প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে : ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যালঘু অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপ। বুধবার সকালে রংপুরের আরডিআরএস বাংলাদেশের বেগম রোকেয়া মিলনায়তনে

রংপুরে সিজিএসের সংলাপ

‘প্রতিটি মানুষ যদি নিজেকে নিরাপদ মনে না করে, তবে গণতন্ত্র অর্থহীন’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। আজ বুধবার সকালে রংপুরের আরডিআরএস বাংলাদেশের বেগম রোকেয়া মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন।

‘প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে: ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যালঘু অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা’ শীর্ষক এই সংলাপে বক্তারা অভিযোগ করেন, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই ভয় ও আতঙ্ক দূর করতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

মূল বক্তার বক্তব্যে সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, প্রান্তিক ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীগুলোই অনেক সময় সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে। গত ১৭-১৮ মাসে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার মতো অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। দেশের প্রত্যেক মানুষ যদি নিজেকে নিরাপদ মনে না করে, তবে সেখানে গণতন্ত্র অর্থহীন। নির্বাচনের সময়, বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্পদ দখলের প্রবণতা দেখা যায়, যা রুখতে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার রাখার দাবি করেন জিল্লুর রহমান।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘আমরা সংখ্যালঘু শব্দটি ব্যবহার করে কাউকে ছোট করতে চাই না। সমতলের আদিবাসী হোক কিংবা ধর্মীয় সংখ্যালঘু, তাদের মাতৃভাষা ও অধিকার রক্ষার বিষয়টি যেন রাজনীতির মূলধারায় থাকে। রাষ্ট্রকে সাংবিধানিকভাবেই তাদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করা লজ্জাজনক উল্লেখ করেন স্বর্ণ নারী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুশ্রী সাহা বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ২৯ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসার পেছনে নিরাপত্তাহীনতাই মূল কারণ।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের রংপুর জেলার সভাপতি সুশান্ত ভৌমিক বলেন, ‘নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুদের বুক কাঁপে। আমাদের প্রধান দাবি হলো নির্বাচনের আগে ও পরে যেন কোনো হামলা না হয়। সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিয়মিত টহল সংখ্যালঘু এলাকাগুলোতে জোরদার করতে হবে।’

সিজিএস সভাপতি জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর মহানগর সভাপতি জোবাইদুল ইসলাম, মানবাধিকারকর্মী মুনির চৌধুরী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মেরিনা লাভলী, দলিত অধিকার আন্দোলনের নেতা সুরেশ বাসফোর প্রমুখ বক্তব্য দেন। বক্তারা বলেন, কেবল সংখ্যার বিচারে নয়, বরং মর্যাদার সঙ্গে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলেই ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফল হবে।

সংলাপে দলিত ও হারিজন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা তাঁদের কষ্টের কথা তুলে ধরেন। মনিলাল রবিদাস ও রাজু বাসফোর বলেন, হরিজন সম্প্রদায় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাঁদের জন্য স্থায়ী আবাসন ও পর্যাপ্ত শিক্ষাব্যবস্থার অভাব রয়েছে।

তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি ও রংপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা বেগম রানী বলেন, ‘আমরা জনসংখ্যার অংশ হওয়া সত্ত্বেও মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন। আবাসন ও মৌলিক সেবা পেতে আমাদের চরম বৈষম্যের শিকার হতে হয়।’

আদিবাসী নেতা নীল শিকারি ও সুমন খালকো অভিযোগ করেন, ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা ও প্রশাসনিক অসহযোগিতার কারণে আদিবাসীরা তাঁদের পৈতৃক জমি হারাচ্ছের। নির্বাচন এলেই তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়, যা বন্ধ হওয়া জরুরি।