বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রকমান ব্যাপারীবাড়ি পর্যন্ত কাঁচা সড়কটি পাকা করার পরিবর্তে করা হয়েছে চাঁন মিয়া সিকদার বাড়ির সড়ক।
একটি কাঁচা সড়ক স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কাগজে-কলমে পাকা ও সংস্কারকাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। এমনকি কাজের বিলের টাকাও তুলে নিয়েছেন ঠিকাদার। তবে বাস্তবে এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ ফুট প্রস্থের সড়কটি কাঁচা ও বেহাল পড়ে আছে। সড়কটির কোথাও কোথাও জমে আছে কাদামাটি। এর ফলে তিনটি গ্রামের সাত হাজারের বেশি মানুষ ও চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তিন শতাধিক শিক্ষার্থী সীমাহীন ভোগান্তি পোহাচ্ছে।
যে সড়কটির কথা বলা হচ্ছে, সেটি পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের বাঁশবাড়িয়া এলাকায়। গত বুধবার দুপুরে বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রকমান ব্যাপারীবাড়ি পর্যন্ত এক কিলোমিটার কাঁচা সড়কটি ঘুরে দেখা যায়, কোথাও কোথাও কাদা শুকিয়ে উঁচু হয়ে আছে। সাধারণত এ সড়কে সাইকেল, মোটরসাইকেল, রিকশা ও অটোরিকশা চলাচলা করে। তবে বর্তমানে যে বেহাল, তাতে রিকশা ও অটোরিকশা চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় ১০ জন ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা প্রথম আলোকে জানান, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে একটি সড়কের বরাদ্দের টাকা দিয়ে অন্য একটি সড়ক পাকা ও সংস্কার করা হয়েছে। দশমিনার উপজেলার বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রকমান ব্যাপারীবাড়ি পর্যন্ত কাঁচা সড়কটি পাকা ও সংস্কারের জন্য বরাদ্দ আসে; কিন্তু সেটা না করে প্রায় ৭০০ মিটার দূরে একই ইউনিয়নের চাঁন মিয়া সিকদারবাড়ির সড়ক সংস্কার ও পাকা করা হয়েছে। অনৈতিক আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমন কাজ করেছে।
জনগুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের বরাদ্দ দিয়ে অনুমোদনহীন অন্য একটি বাড়ির সড়ক পাকা করা হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক।জাহিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক, সুজন, দশমিনা
এলজিইডির দশমিনা উপজেলা কার্যালয় থেকে এ–সংক্রান্ত একটি নথি পেয়েছে প্রথম আলো। সেই নথিতে দেখা যায়, দশমিনার বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রকমান ব্যাপারীবাড়ি পর্যন্ত এক কিলোমিটার সড়কটি (আইডি নম্বর ৫৭৮৫২৫১৩৩) বিটুমিনাস কংক্রিটের (বিসি) তৈরি বা পিচঢালাই করা। ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটি প্রথম পাকা করা হয়।
বাস্তবে তখনো সড়কটি পাকা করা হয়নি। এ সড়কের পরিবর্তে পাকা করা হয়েছে মূলত চাঁন মিয়া সিকদারবাড়ির সড়ক। অথচ এলজিইডির তালিকায় চাঁন মিয়া সিকদারবাড়ির সড়কটির কোনো অনুমোদন বা আইডি নম্বর নেই।
এলজিইডির একটি সূত্র বলছে, সর্বশেষ গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও সেতু সংরক্ষণ ও সংস্কার (জিওবি-এম) প্রকল্পের আওতায় বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রকমান ব্যাপারীবাড়ি পর্যন্ত সড়ক সংস্কারের জন্য ৩৩ লাখ ৮ হাজার ৮৮৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি পায় মেসার্স একতা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ মার্চ সংস্কারকাজ শেষ হলে গত ২৭ এপ্রিল ঠিকাদারকে চূড়ান্ত বিলের টাকা পরিশোধ করে এলজিইডি।
কাঁচা সড়কটি দিয়ে বাঁশবাড়িয়া, মধ্যবাঁশ বাড়িয়া ও গছানী—এই তিন গ্রামের লোকজন যাতায়াত করেন। এ ছাড়া মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, রজ্জবিয়া দাখিল মাদ্রাসা, মধ্য বাঁশবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আকরাম খান রেজিস্ট্রি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সড়কটি দিয়ে চলাচলে দুর্ভোগ পোহায়।
এবারও একই কাজ করা হয়েছে। অর্থাৎ বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রকমান ব্যাপারীবাড়ি পর্যন্ত কাঁচা সড়কটির পরিবর্তনে প্রায় একই দৈর্ঘ্যের চাঁন মিয়া সিকদার বাড়ির সড়কটি সংস্কার করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. মাসুদ রানা প্রথম আলোকে বলেন, তিনি দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি পান। উপজেলা প্রকৌশলী ও তদারকের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী তাঁকে যে সড়কটিতে কাজ করতে বলেছেন, সেখানেই তিনি কাজ করেছেন। এখানে তাঁর কোনো দায় নেই।
সড়কটির কাজ তদারকির দায়িত্বে ছিলেন এলজিইডির দশমিনা উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. লুৎফর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০১০-১১ অর্থবছরে যে সড়কে কাজ হয়েছিল, তিনি সেখানেই কাজ করিয়েছেন। এক সড়কের বরাদ্দ দিয়ে অন্য সড়ক সংস্কারের নিয়ম আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভুল তো আগেই হয়েছে, তাঁর কিছু করার নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আনিস খান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ও মো. মহিবুল খানের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, দশমিনা এলজিইডি কর্তৃপক্ষ অনৈতিক সুবিধা নিয়ে একটি বাড়ির সামনের সড়ক পাকা করে দিয়েছে।
একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের বরাদ্দ করা অর্থ দিয়ে আইডিবিহীন অন্য কোনো সড়ক নির্মাণ বা সংস্কার করার কোনো সুযোগ নেই।এ টি এম সাদিকুর রহমান, এলজিইডির দশমিনা উপজেলা প্রকৌশলী
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) দশমিনা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের বরাদ্দ দিয়ে অনুমোদনহীন অন্য একটি বাড়ির সড়ক পাকা করা হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক। তিনি তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের শাস্তি দাবি করেন।
কাঁচা সড়কটি দিয়ে বাঁশবাড়িয়া, মধ্যবাঁশ বাড়িয়া ও গছানী—এই তিন গ্রামের লোকজন যাতায়াত করেন। এ ছাড়া মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, রজ্জবিয়া দাখিল মাদ্রাসা, মধ্য বাঁশবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আকরাম খান রেজিস্ট্রি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সড়কটি দিয়ে চলাচলে দুর্ভোগ পোহায়।
এলজিইডির দশমিনা উপজেলা প্রকৌশলী এ টি এম সাদিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের বরাদ্দ করা অর্থ দিয়ে আইডিবিহীন অন্য কোনো সড়ক নির্মাণ বা সংস্কার করার কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু ঘটনাটি তাঁর যোগদানের আগের, তাই বিস্তারিত না জেনে বলতে পারছেন না। বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।