মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার খবর পেয়ে বাড়িটিতে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শুক্রবার দুপুরে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার পৌর শহরের ধানহাটা এলাকায়
মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার খবর পেয়ে বাড়িটিতে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শুক্রবার দুপুরে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার পৌর শহরের ধানহাটা এলাকায়

লক্ষ্মীপুরে চার খুন

মা ও তিন বোনের লাশ নিয়ে কুমিল্লার পথে কিশোর

এক দিন আগেও যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছে, একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন দেখেছে, শুক্রবার সেই মা, তিন বোনসহ চারটি লাশের পাশে দাঁড়িয়ে শেষবিদায় জানাল কিশোর জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। ১৬ বছর বয়সী কিশোরের চোখে অশ্রু, মুখে নীরবতা।

বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরে নৃশংস হামলায় নিহত হন মা ও তাঁর তিন মেয়ে। চারজনের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার বিকেলে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল থেকে রায়পুরে আনা হয়। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে পৌর শহরের ধানহাটা এলাকায় তাঁদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্বজন, প্রতিবেশী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শত শত মানুষ অংশ নেন। পুরো এলাকা ছিল শোকে স্তব্ধ। চারটি লাশ পাশাপাশি রাখা হলে উপস্থিত অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

জানাজার কাতারে ছিল পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য কিশোর জুনায়েদ ইসলাম। এক দিন আগেও যে মা ও তিন বোনের ভালোবাসা ছিল তাকে ঘিরে। এবার তাঁদেরই জানাজায় অংশ নিয়ে শেষবিদায় জানাল সে। জানাজা শেষে স্বজনদের সঙ্গে মা ও তিন বোনের লাশ মাইক্রোবাসে করে কুমিল্লার পথে রওনা হয় কিশোর জুনায়েদ। সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হবে।

লাশ চারটির ময়নাতদন্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা অরুপ রায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ময়নাতদন্তে প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। নিহত মা ও তিন মেয়ের মাথা, বুকে ও হাতে অনেক জখম ছিল। ময়নাতদন্তের পর পুলিশের কাছে লাশ হস্তান্তর করেছে কর্তৃপক্ষ।

এদিকে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় রায়পুর থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে। নিহত শাহীনুর বেগমের ছেলে জুনায়েদ ইসলাম বাদী হয়ে শুক্রবার এ মামলা করে। মামলায় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার ছাড়া বাকিদের অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীর পাড়ের একটি ভাড়া বাসায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হন শাহীনুর বেগম (৪০) এবং তাঁর তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), ইকরা বেগম (১৭) ও সিপা (১০)। তাঁদের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায়। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা রায়পুরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের পর পালানোর সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে স্থানীয় লোকজন আটক করে পিটুনি দেন। পরে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁরও মৃত্যু হয়। তিনি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা।

স্থানীয় লোকজন জানান, জীবিকার সন্ধানে কুমিল্লা থেকে রায়পুরে এসেছিলেন পরিবারটি কর্তা কামাল হোসেন। ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান তিনি। সেই থেকে শাহীনুর বেগমই চার সন্তানকে নিয়ে সংগ্রাম করে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। তবে বৃহস্পতিবার দুপুরে শেষ হয়ে যায় সেই সংগ্রামের গল্প। এখন কিশোর জুনায়েদ ইসলামের কাঁধে রয়ে গেল শুধু মা ও তিন বোনকে হারানোর অসহনীয় স্মৃতি।

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দাসহ আলামত জব্দ করা হয়েছে। ঘটনাটি একজনই সংঘটিত করেছেন বলে জানা গেছে। প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।