বিদ্যুৎকেন্দ্রের পোড়া তেল মিশছে সাঙ্গু নদে। সম্প্রতি সাতকানিয়ার কালিয়াইশ ইউনিয়নের মলেয়াবাদ এলাকায়
বিদ্যুৎকেন্দ্রের পোড়া তেল মিশছে সাঙ্গু নদে। সম্প্রতি সাতকানিয়ার কালিয়াইশ ইউনিয়নের মলেয়াবাদ এলাকায়

খাল হয়ে ভেসে আসছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পোড়া তেল, সাঙ্গু নদে দূষণ

বিদ্যুৎকেন্দ্রের ড্রেন থেকে বের হচ্ছে কালচে তৈলাক্ত বর্জ্য। সেই বর্জ্য গিয়ে পড়ছে পাশের খালে। আবার খাল হয়ে কিছু দূরে গিয়েই এসব বর্জ্য মিশছে সাঙ্গু নদে। সম্প্রতি এমনই দৃশ্য দেখা যায় চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কালিয়াইশ ইউনিয়নে।

এলাকাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) দোহাজারী-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের পোড়া ফার্নেস অয়েলের স্লাজ আশপাশের খাল, কৃষিজমি ও সাঙ্গু নদে দূষণ সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের।

গত শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় ৩০০ মিটার পূর্বে উত্তর কালিয়াইশের মইল্যার ডেবা (জলাধার) এলাকা থেকে উৎপত্তি হয়েছে একটি খাল। মইল্ল্যা খাল নামের খালটি প্রবাহিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষিণ পাশ দিয়েই। বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে প্রবাহিত হয়ে মলেয়াবাদ গ্রামের চাগাচর এলাকায় সাঙ্গু নদে মিশেছে খালটি।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি অংশে খালের পানি কালচে আকার ধারণ করেছে। খালের পানি, পাশের গাছ ও লতাপাতায় কালো স্লাজ লেগে থাকতে দেখা যায়। পানি থেকে দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছে। স্লাজ ও তেলমিশ্রিত পানি খাল হয়ে সাঙ্গু নদে গিয়ে পড়ছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য সরাসরি খালে পড়া বন্ধ না হলে শুধু খাল পরিষ্কার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বর্জ্য কোথা থেকে বের হচ্ছে, কীভাবে তা খালে যাচ্ছে এবং এর পরিশোধনের ব্যবস্থা কী—এসব বিষয় তদন্ত করে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আবদুল গফুর, সদস্য, কালিয়াইশ ইউনিয়ন পরিষদ

স্থানীয় বাসিন্দা ও উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একসময় মইল্ল্যা খালের পানি ব্যবহার করে খালের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকার দুই পাশে শতাধিক কৃষক প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করতেন। তবে দূষণসহ নানা কারণে এখন চাষাবাদ কিছুটা কমেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর পর থেকে কেন্দ্রের ভেতর থেকে বের হওয়া কালো স্লাজ খালের পানিতে মিশছে বলে স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ। এতে খালের পানি কালচে হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বর্তমানে খালের পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করা যায় না। খালে মাছসহ জলজ প্রাণীর সংখ্যাও কমে গেছে বলে তাঁরা জানান।

২০১১ সালের শুরুতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হয়। সাতকানিয়া উপজেলার কেরানীহাট স্টেশন থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ধরে প্রায় ছয় কিলোমিটার উত্তরে দোহাজারী বিওসির মোড় এলাকায় মহাসড়কের পূর্ব পাশে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অবস্থান।

এ বছরের জুলাইয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামে হওয়া বন্যার সময় খাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে জমে থাকা স্লাজ আশপাশের কৃষিজমি ও লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান। এরপর তাঁরা বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হন। ১২ সেপ্টেম্বর স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধন করেন। পরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপকের কাছে অভিযোগও দেওয়া হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রায় ১০ দিন আগে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ খাল থেকে পোড়া তেলের স্লাজ অপসারণের কাজ শুরু করেছে। এতে খালে স্লাজের পরিমাণ কমতে শুরু করেছে।

কালিয়াইশ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল গফুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য সরাসরি খালে পড়া বন্ধ না হলে শুধু খাল পরিষ্কার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বর্জ্য কোথা থেকে বের হচ্ছে, কীভাবে তা খালে যাচ্ছে এবং এর পরিশোধনের ব্যবস্থা কী—এসব বিষয় তদন্ত করে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

নদী গবেষক ও বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য মো. মনজুরুল কিবরীয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘মইল্ল্যা খালটি সাঙ্গু নদের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে পোড়া তেলের স্লাজ বৃষ্টির পানি ও জোয়ারের স্রোতের সঙ্গে সাঙ্গু নদে পৌঁছাচ্ছে। এতে নদীর পানি ও জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফার্নেস অয়েল ও তেলজাতীয় বর্জ্য পানিতে মিশলে পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হবে।’

বিদ্যুৎকেন্দ্রের পোড়া ফার্নেস অয়েলের কালো স্লাজ খালের পানিতে ভাসছে। সম্প্রতি সাতকানিয়ার কালিয়াইশ ইউনিয়নের মলেয়াবাদ এলাকায়

মো. মনজুরুল কিবরীয়া আরও বলেন, ‘খাল ও নদে পোড়া তেলের স্লাজ ফেলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এতে মাছসহ জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে। উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে এটি বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’

খালে বর্জ্য পড়ার ঘটনাকে ‘অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা’ উল্লেখ করে দোহাজারী-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অতিবৃষ্টি ও ওভারফ্লোর কারণে কিছু পানিমিশ্রিত ফার্নেস অয়েলের স্লাজ খালে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগের পর আমরা শ্রমিক নিয়োগ করে বর্জ্য অপসারণের কাজ শুরু করেছি। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধ করতে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের সঙ্গে আমরা বসব এবং তাঁদের সমস্যার সমাধান করব।’

কালিয়াইশ ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. ইসমাইল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রটি আমাদের জন্য সম্পদ। তবে এটি দ্বারা স্থানীয় বাসিন্দারা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটিও খেয়াল রাখতে হবে। খালে জমে থাকা কালচে তৈলাক্ত বর্জ্য অপসারণ শুরু করায় স্থানীয় লোকজন কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে এটির স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক মঈনুদ্দিন ফয়সাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও দূষিত স্থান পরিদর্শন করে পানির নমুনা সংগ্রহ করেছি। দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। পরীক্ষার ফল পেতে কয়েক দিন সময় লাগবে। তারপর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’