
বাংলাদেশ সময় গত সোমবার রাত আটটার দিকে ছেলে সিয়ামকে কল করেছিলেন বাবা নূর মোহাম্মদ। কথার ফাঁকে বলেছিলেন, আগামী দেড় বছরের জন্য কাজের অনুমতিপত্র হাতে পেয়েছেন। কাগজটি না পেলে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দেশে ফিরে আসতে হতো। ছেলে তখনো জানতেন না, এটিই বাবার সঙ্গে তাঁর শেষ কথা।
কয়েক ঘণ্টা পর গতকাল মঙ্গলবার ভোরে আসে আরেকটি কল। জানানো হয়, দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউনের একটি সুপারশপে অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন নূর মোহাম্মদ।
গতকাল ভোরের আগে আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় ঘটা ওই দুর্ঘটনায় নূর মোহাম্মদসহ ছয় বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনই নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা। তাঁরা হলেন সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের কোকের চর এলাকার মো. ফাহিম (২৯) ও মো. আপন (২৩), আলীরটেক এলাকার নূর মোহাম্মদ (৫৫), বক্তাবলী ইউনিয়নের তৈলখিরার চর এলাকার মো. ফয়সাল (২৬) এবং কানাইনগর এলাকার মো. শাহিন (৩০)। অন্যজন মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিম পৌরসভার কালিন্দিপাড়া এলাকার মো. রাজিক (৫৫)।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই কোকের চর, তৈলখিরার চর ও কানাইনগর গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজন ও প্রতিবেশীরা এখন অপেক্ষা করছেন ওই পাঁচজনের শেষবারের মতো দেশে ফেরার।
প্রায় আট বছর ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলেন নূর মোহাম্মদ। এর আগে ১০ বছর কাজ করেছেন সিঙ্গাপুরে। দেশে স্ত্রী কামরুন নাহার, দুই মেয়ে সায়মা ও সাদিয়া এবং একমাত্র ছেলে সিয়াম আছেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলে সিয়াম এবার নারায়ণগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন।
শেষ ফোনালাপের বিষয়ে বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সিয়াম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাবা সবার খোঁজখবর নিলেন। আফ্রিকার পরিস্থিতির কথা বললেন। বললেন, দেড় বছরের কাগজ হাতে পেয়েছেন। কাগজ না পেলে দেশে ফিরে আসতে হতো। কে জানত, এটাই শেষ কথা হবে!’
কান্নার একপর্যায়ে আক্ষেপ করছিলেন সিয়াম। তিনি বলে ওঠেন, ‘বাবা আমাদের জন্য কষ্ট করতে গিয়ে পুরো জীবনটাই প্রবাসে কাটিয়ে দিলেন। এখন আর বাবা বলে ডাকার কেউ রইল না। তাঁর আয়ে সংসার চলত। এখন মনে হচ্ছে, সংসারের দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে।’
সংসারের অভাব ঘোচাতে একই গ্রামের মো. আপন চার বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।
আপনের বাবা আলী মিয়া একটি ছোট চায়ের দোকান চালান। বড় ছেলে আগে সৌদি আরবে ছিলেন, এখন দেশে ফিরেছেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, আপনের পাঠানো টাকায় সংসার চলত। দুই ভাই মিলে একটি একতলা বাড়ি নির্মাণ শুরু করেছিলেন। ছাদ ঢালাই পর্যন্ত হলেও কাজ শেষ হয়নি। এখন সংসার চালানো নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আলী মিয়া বলেন, ‘এত অল্প বয়সে ও আমাদের ছেড়ে চলে যাবে, এটা কখনো ভাবিনি।’ এ কথা শেষ করার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
আপনের মামা রাসেলের দাবি, পরিবারটির ঋণ আছে। বিদেশ থেকে পাঠানো টাকায় সংসার চলত। এখন পরিবারটি বড় সংকটে পড়বে।
একই গ্রামের ফাহিম প্রায় ১১ বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন। পরিবারের আশা ছিল, তিনি একদিন ফিরে সংসারের দায়িত্ব আরও ভালোভাবে নেবেন। সেই অপেক্ষার অবসান হলো মৃত্যুসংবাদে।
ফাহিমের ভগ্নিপতি মো. সজীব প্রথম আলো বলেন, ‘খবরটি পাওয়ার পর পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছে। এই শোক কাটিয়ে ওঠা কঠিন।’
গতকাল বিকেলে ওই পাঁচজনের পরিবার সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাড়িতে যান নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ দ্রুত দেশে আনা এবং পরিবারের সদস্যরা যাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ পান, এ জন্য প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ওই সুপারশপের মালিক নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রওশন আলী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা অন্য কোনো কারণে আগুন লাগতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তিনি নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।