সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের মনোয়ারা বেগম। উপজেলার গারাদহ ইউনিয়নের গারাদহ দক্ষিণ পাড়া গ্রামে তাঁর বাড়িতে
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের মনোয়ারা বেগম। উপজেলার গারাদহ ইউনিয়নের গারাদহ দক্ষিণ পাড়া গ্রামে তাঁর বাড়িতে

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর

ডালের বড়ি বানিয়ে স্বাবলম্বী মনোয়ারা

অন্যের জমি বর্গা চাষ করে যা আয় হতো, তা দিয়ে কোনোরকমে চলত মনোয়ারা বেগমের সংসার। অর্ধহারে-অনাহারে কাটত তাঁদের দিন। এর মধ্যে পরিবারে আসে তিন সন্তান। তখন বাড়তি কিছু আয় করতে ডালের বড়ি তৈরি করা শেখেন। দেড় বছর পরই তাঁর এ ব্যবসা জমে ওঠে। মুনাফার টাকায় সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর পাশাপাশি অন্য সহায়-সম্পত্তিও গড়েছেন তিনি।

মনোয়ারা বেগমের (৪৫) বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার গারাদহ ইউনিয়নের গারাদহ দক্ষিণপাড়া গ্রামে। তাঁর স্বামীর নাম নজরুল ইসলাম। ২৫ বছর আগে তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাঁর স্বামী অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করতেন। তিন সন্তানের জন্মের পর বেড়ে যায় অভাব-অনটন।

মনোয়ারা বলেন, পাবনা জেলা শহরের শালগাড়িয়া এলাকায় একবার তাঁর বড় ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে যান। সেখানে এলাকার নারীদের ডালের বড়ি বানিয়ে তা বাজারে বিক্রি করতে দেখেন। তাঁদের কাছ থেকে তিনি ডালের বড়ি তৈরির প্রক্রিয়াটি শিখে আসেন। এরপর বাড়িতে এসে তিনিও বড়ি বানানো শুরু করেন।

২০০১ সালে ১৫ কেজি অ্যাংকর ডাল কিনে এনে বড়ি বানান। এতে লাভ হয় ৩০০ টাকা। এরপর ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। মাত্র দেড় বছরেই তাঁর এই ব্যবসা জমে ওঠে। এরপর এই বড়ি তৈরির ব্যবসার মুনাফার টাকায় সংসার চালানোর পাশাপাশি দুটি গাভি, তিনটি ছাগল, হাঁস-মুরগি কিনে লালনপালন করেন। এভাবে ঘুচে যায় তাঁর সংসারের অভাব। এ বড়ি তৈরির টাকাতেই নিজের থাকার জন্য ঘর তুলেছেন, দুই ছেলেকে ঘর তুলে দিয়েছেন, কিনেছেন ডাল ভাঙানোর যন্ত্র। এখন এই কাজে তাঁর পরিবারের সদস্যসহ ১২ জন নারী তাঁকে সহায়তা করছেন।

মনোয়ারা বলেন, প্রথমে প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা ধরে পানিতে ভেজানো ডাল পাটায় বেটে নিতেন। এরপর বাড়ির উঠানে রোদে বসে টিনে নারকেল তেল মাখিয়ে তাতে ডালের বড়ি তৈরি করে শুকাতে দিতেন। বড়ি শুকাতে দুই-তিন দিন লাগত।

দিনে কত কেজি মাষকলাই ডালের বড়ি তৈরি করতে পারেন, এ প্রশ্নে মনোয়ারা বলেন, একজনের পক্ষে দিনে পাঁচ কেজি বড়ি তৈরি করা সম্ভব। ১০ কেজি ডালে ৯ কেজি বড়ি হয়। প্রতি কেজি মাষকলাই ডালের বড়ি তৈরিতে ১৬০-২০০ টাকা খরচ হয়। বিক্রি হয় ৩০০-৩৫০ টাকায়। অ্যাংকর ডালের বড়ি তৈরিতে খরচ হয় প্রতি কেজি ৮০ টাকা, বিক্রি হয় ১২০ টাকায়। এখন প্রতি সপ্তাহে লাভের টাকা থেকে ঋণের কিস্তি শোধ করেন। আর তাঁর স্বামীকে একটি নাগরদোলা কিনে দিয়েছেন। মেলায় মেলায় গিয়ে তিনি এ নাগরদোলা চড়িয়ে আয় করছেন।

মনোয়ারা বলেন, এখন সংসারে অভাব না থাকলেও অভাবের দিনগুলো ভোলেননি তিনি। তাই নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পর থেমে থাকেননি। তিনি গ্রামে ঘুরে ঘুরে দুস্থ মেয়েদের বড়ি তৈরি করা শিখিয়ে স্বনির্ভর হতে সহযোগিতা করছেন।