টেকনাফের বাহারছড়া এলাকা থেকে গত বৃহস্পতিবার উদ্ধার করা হয় ছয় খণ্ড করা লাশ
টেকনাফের বাহারছড়া এলাকা থেকে গত বৃহস্পতিবার উদ্ধার করা হয় ছয় খণ্ড করা লাশ

ছয় খণ্ডের মরদেহের পর মাথাবিহীন নারীর লাশ উদ্ধার, কক্সবাজারে দুই খুন ভাবাচ্ছে পুলিশকে

কক্সবাজারে ছয় খণ্ডের মরদেহের পর এবার মাথা ও কবজিবিহীন নারীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার বিকেল চারটার দিকে কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের দক্ষিণ জানারঘোনা এলাকায় একটি পরিত্যক্ত পুকুরের পাড়ে কম্বলে মোড়ানো অবস্থায় মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয়। ওই এলাকায় দুর্গন্ধ টের পেয়ে স্থানীয় লোকজন পুলিশে খবর দেন। এরপর পুলিশ এসে লাশটি উদ্ধার করে। লাশটি অর্ধগলিত অবস্থায় ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এ ঘটনার দুই দিন আগে গত বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের টেকনাফের দক্ষিণ কচ্ছপিয়া এলাকায় হোছনী খালের কালভার্টের নিচ থেকে বস্তাভর্তি ছয় খণ্ড করে কাটা একটি পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

জেলা সদর ও টেকনাফে দুই দিনের ব্যবধানে এমন বিকৃত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ভাবিয়ে তুলেছে পুলিশকে। পুলিশ জানায়, কক্সবাজারে উদ্ধার করা নারীর মরদেহের সঙ্গে মাথা ও হাতের কবজি পাওয়া যায়নি। আবার টেকনাফে উদ্ধার মরদেহের হাতের চামড়া তুলে নেওয়া হয়। পুলিশ যাতে মৃতদেহের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে না পারে, সে জন্য খুনিরা এমন কৌশল বেছে নেয়।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার ঝিলংজা ইউনিয়নের দক্ষিণ জানারঘোনা এলাকা থেকে উদ্ধার করা নারীর মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত করা না গেলেও স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে পুলিশ জেনেছে, নিহত নারী সাদিয়া আক্তার মুন্নি (২৮) হতে পারেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত রমজানের মাঝামাঝি সময়ে মুন্নি ও তাঁর স্বামী দক্ষিণ জানারঘোনায় একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। মুন্নির স্বামী সাইফুর রহমান নিজেকে গাড়িচালক পরিচয় দিতেন। আর মুন্নি গৃহিণী ছিলেন। কিন্তু ঈদের পর থেকে তাঁদের কাউকে এলাকায় দেখা যায়নি। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। তবে স্বজনদের দাবি, ২৭ মার্চ থেকেই মুন্নি নিখোঁজ ছিলেন।

মরদেহ উদ্ধারে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) সঞ্জীব পাল কুন্ডু। তিনি বলেন, প্রাথমিক ধোঁয়াশা কাটিয়ে স্থানীয় ব্যক্তিদের তথ্যের ভিত্তিতে নিহত নারীকে সাদিয়া আক্তার মুন্নি হিসেবে শনাক্ত করা হয়। তিনি মহেশখালী উপজেলার জাগিরাঘোনা এলাকার বাসিন্দা। তাঁর স্বামী সাইফুর রহমান এখন পলাতক। হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সঞ্জীব পাল বলেন, ওই নারীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। পেশাদার খুনির কাজ এটি।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ছমি উদ্দিন বলেন, ‘মরদেহটি অর্ধগলিত অবস্থায় পাতলা কম্বলে মোড়ানো ছিল। মাথা ও কবজি বিচ্ছিন্ন থাকায় এটি অত্যন্ত রহস্যজনক। আমরা এখনো নারীর মাথাটি উদ্ধার করতে পারিনি।’

ওসি ছমি উদ্দিন আরও বলেন, ‘মুখমণ্ডল ও হাতের আঙুল না পাওয়ায় তাঁর পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। স্বজন দাবি করা ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর ডিএনএ মেলানো হবে।’

পুলিশ জানায়, এ ঘটনার দুই দিন আগে গত বৃহস্পতিবার টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ কচ্ছপিয়া এলাকায় হোছনী খালের একটি কালভার্টের নিচে পড়ে থাকা কয়েকটি বাজারের থলে ঘিরে কুকুরের অস্বাভাবিক আচরণ নজরে আসে পথচারীদের। সন্দেহ হলে পুলিশে খবর দেওয়া হয়।

পুলিশ গিয়ে থলে খুলতেই বেরিয়ে আসে টুকরা করে কাটা মানবদেহের ছয়টি খণ্ডাংশ। পরে সেগুলো এক জায়গায় রেখে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি একজন পুরুষের মরদেহ। তবে পরিচয় এখনো অজানা।

বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ (পরিদর্শক) দুর্জয় বিশ্বাস নিশ্চিত করেন, ‘ধারালো অস্ত্র দিয়ে দেহটি টুকরা করা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর গুমের জন্য বস্তায় ভরে খালে ফেলে দেওয়া হয়েছে। যেন জোয়ারে ভেসে সাগরে চলে যায়।’

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, খণ্ডিত অংশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। এখনো পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দুটি ঘটনাতেই খুনিরা অত্যন্ত সচেতনভাবে ভুক্তভোগীদের পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করেছে। টেকনাফের ঘটনায় নিহত ব্যক্তির হাতের চামড়া তুলে ফেলা হয়েছে। যাতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করা না যায়। ঝিলংজার ঘটনায় নারীর মাথা ও কবজি কেটে আলাদা করে গুম করা হয়েছে। যাতে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়।

পুলিশ পরিদর্শক দুর্জয় বিশ্বাসের মতে, এসব ধরন (প্যাটার্ন) স্পষ্টতই পেশাদার অপরাধী চক্রের ইঙ্গিত বহন করে। আমরা সম্ভাব্য সূত্র ধরে তদন্তে এগোচ্ছি।’

পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘খুনের ধরন ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে নৃশংসতা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এটি তদন্তে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তবে কোনো অপরাধই শতভাগ নিখুঁত নয়। অপরাধীরা অজ্ঞাতসারে কোনো না কোনো ক্লু রেখে যায়।’