চট্টগ্রাম নগরের চাক্তাই এলাকার একটি কারখানায় লাচ্ছা সেমাই তৈরির পর ঝুড়িতে রাখছেন এক শ্রমিক। গতকাল দুপুরে
চট্টগ্রাম নগরের চাক্তাই এলাকার একটি কারখানায় লাচ্ছা সেমাই তৈরির পর ঝুড়িতে রাখছেন এক শ্রমিক। গতকাল দুপুরে

চট্টগ্রামে কোন সেমাইয়ের কদর কেমন, কোনটি জনপ্রিয়

ঘিয়ে ভাজা মিহি সাদা রেশমি সুতার মতো লাচ্ছা কিংবা বাদামি রঙের বাংলা সেমাই; ঈদ আয়োজনে কোনটি চট্টগ্রামবাসীর বেশি পচ্ছন্দের? এককথায় এর উত্তর মিলবে না। দুটি সেমাইয়ের রান্নার রেসিপি আলাদা। ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাইয়ে বাদাম কিশমিশ দেওয়া ঘন গরম দুধ দিলেই তৈরি। আর বাংলা সেমাই আগে অল্প আঁচে ঘিয়ে ভেজে নিতে হয়, এরপর বাদাম কিশমিশ সহযোগে ঘন দুধ ঢেলে দিতে হবে। স্বাদ আলাদা হলেও দুই রকমের সেমাইয়েরই কদর আছে। কেবল এই দুই রেসিপির কথা বাদ দিলেও সেইয়ের জর্দা, আরবের বাসবুসা বা বাকলাভা তৈরিতেও এই দুই সেমাইয়ের ব্যবহার রয়েছে।

চট্টগ্রামের বাজারগুলোয় বাংলা, লাচ্ছা দুই রকমের সেমাই বিক্রি হচ্ছে। খোলা ও প্যাকেটজাত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে এসব সেমাই। গতকাল বৃহস্পতিবার নগরের বহদ্দারহাট বাজারে কথা হয় বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুস সালামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঈদের দুই দিন আগে থেকে মূলত সেমাই-চিনি কেনার তোড়জোড় শুরু হয়। এখন লাচ্ছা সেমাইয়ের চল বেশি। তবে বাংলা সেমাইও নিয়েছি অল্প।’
একসময় হাতে তৈরি সেমাইয়ের কদর ছিল ঘরে ঘরে। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট কারখানায় উৎপাদন করা হতো খোলা সেমাই। এখন সময়ের বিবর্তনে বাজার দখল করে নিয়েছে প্যাকেটজাত সেমাই।

নগরের বাজারগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর ঈদের বাজারে প্যাকেটজাত সেমাইয়ের তেমন দাম বাড়েনি। গত বছরে মতো একই দামে বিক্রি হচ্ছে এসব সেমাই। তবে বাংলা সেমাইয়ের দাম (চিকন সেমাই) কিছুটা বেড়েছে।

কোন সেমাইয়ের চাহিদা বেশি

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার লাচ্ছা ও চিকন—দুই ধরনের সেমাই এখন বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। বাজারে বর্তমানে প্যাকেটজাত লাচ্ছা সেমাইয়ের চাহিদাই বেশি। চালের গুঁড়া ও ময়দার তৈরি চিকন সেমাইয়ের চাহিদা কম। সব মিলিয়ে সেমাইয়ের চাহিদা অন্যান্য বছরের চেয়ে কম। মানুষ এখন বাংলা সেমাই বা চিকন সেমাই তেমন কেনেন না। তবু পুরোনো ব্যবসায়ীরা দোকানে এসব সেমাই রাখেন।

সারা বছর সেমাই বেচাকেনা হয় না তেমন। বছরে মোট বেচাকেনার ৯০ শতাংশই বিক্রি হয় ঈদের সময়। বড় বড় কোম্পানি সেমাইয়ের বাজারে আসার পর ছোট ছোট কোম্পানির সংখ্যা কমছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, বনফুল, কিষোয়ানসহ অনেক শিল্পগোষ্ঠী বর্তমানে সেমাই বাজারজাত করছে। চট্টগ্রাম নগরে চাক্তাই এলাকায় একসময় ৩৫টির বেশি সেমাই উৎপাদনকারী কারখানা ছিল। এখন সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ থেকে ২০–এ।

বর্তমানে নগরের বাকলিয়া, চাক্তাই, রাজাখালী, খাতুনগঞ্জ, আছাদগঞ্জ, মাদারবাড়িসহ কয়েকটি এলাকার কারখানাগুলোয় তৈরি হয় চিকন সেমাই। নগরের বিভিন্ন কারখানায় তৈরি করা এই সেমাই যায় জেলার ১৫ উপজেলাসহ এ অঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকায়। তবে এখন আর এই সেমাইয়ের কদর আগের মতো নেই। বাজার দখল করে প্যাকেটজাত সেমাই।

নগরের বহদ্দারহাট এলাকার মুদিদোকানি নাজিম উদ্দিন বলেন, এককালে ঈদের সময় কয়েক শ কেজি বাংলা সেমাই বিক্রি হতো। এখন ১০ থেকে ২০ কেজিও হয় না। অনেকেই সেমাইয়ের জর্দা করার জন্য কেনে। বাকিদের চাহিদা প্যাকেটজাত সেমাই। লাচ্ছা সেমাইয়ের চাহিদা বেশি। কারণ, ঝুটঝামেলা কম।

বাজারে দরদাম কেমন

আজ চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ২০০ গ্রাম ওজনের প্যাকেটজাত লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। ২০০ গ্রাম ওজনের প্যাকেটজাত চিকন সেমাইও বিক্রি হচ্ছে একই দামে। ব্র্যান্ডভেদে ঘি ও কিশমিশযুক্ত প্যাকেটজাত সেমাই পাওয়া যাচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায়। গত এক বছরে এসব সেমাইয়ের দাম বাড়েনি বলে জানিয়েছেন দোকানিরা।

এদিকে গত বছর খোলা চিকন সেমাই প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকার আশপাশে ছিল। এ বছরও প্রায় একই দামে বিক্রি হচ্ছে চিকন সেমাই। তবে কিছু বাজারে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাম চাওয়া হচ্ছে। লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকার আশপাশে। তবে দামি লাচ্ছা সেমাইও রয়েছে। বিভিন্ন ব্যান্ডের ঘি ও কিশমিশযুক্ত সেমাই পাওয়া যাচ্ছে ২৫০ ও ৪০০ গ্রাম ওজনের প্যাকেটে। এ ক্ষেত্রে প্রতি প্যাকেটের দাম পড়বে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা।

নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারের মুদিদোকানি ইকবাল হোসেন বলেন, আজ থেকে ২০ বছর আগেই সেমাই ছাড়া ঈদ চিন্তা করা যেত না। শহরের বড় পরিবারগুলো, বিশেষ করে বনেদি পরিবারগুলো কয়েক কেজি সেমাই নিয়ে যেত। এখন সেই দিন নেই। এখন নানা ব্র্যান্ডের সেমাই বাজারে। দাম বাড়েনি; কারণ, চাহিদাও আগের মতো নেই।