
কয়েক সেকেন্ড আগেও সবকিছু ছিল স্বাভাবিক। আদালতের প্রধান ফটক দিয়ে একজন বেরিয়ে গেলেন, আরেকজন ঢুকলেন। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন কয়েকজন। হঠাৎ বিস্ফোরণ—তারপরই আতঙ্কে সরে গেলেন আশপাশের লোকজন। বরিশাল আদালত চত্বরে বিস্ফোরণের আগমুহূর্তের এমন দৃশ্য ধরা পড়েছে সিসিটিভি ক্যামেরায় ফুটেজে।
আজ বুধবার আদালতের কার্যক্রম চলাকালে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা পৌনে ১১টার মধ্যে আদালতের প্রবেশপথের বাঁ পাশে বিস্ফোরণটি ঘটে। এতে কেউ হতাহত হয়নি, তবে বিস্ফোরণের ঘটনায় বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। বিস্ফোরণের কারণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা জানতে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করছে পুলিশ।
বিস্ফোরণের সময়ের সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ফুটেজ প্রথম আলোর হাতে এসেছে। ফুটেজে দেখা যায়, বিস্ফোরণের ঠিক আগে ঘটনাস্থলের পাশে একজন বয়স্ক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর কিছুটা দূরে কালো বোরকা পরা কয়েকজন নারী এবং আরেকজন বয়স্ক ব্যক্তি অবস্থান করছিলেন। এ সময় লাল রঙের একটি শপিং ব্যাগ হাতে একজন ব্যক্তি আদালতের প্রধান ফটক দিয়ে বাইরে বের হয়ে যান। একই সময়ে অল্প বয়সী আরেক ব্যক্তি হাতে একটি কাগজ নিয়ে ফটক দিয়ে আদালত চত্বরে প্রবেশ করছিলেন। এরপরই হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে।
সিসিটিভি ফুটেজে বাইরে থেকে কেউ একটি বস্তু ছুড়ে মারার বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য, বিস্ফোরণের ধরন, উদ্ধার করা আলামত ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে এটি ককটেল সদৃশ বস্তু বলে মনে হচ্ছে।আবু রায়হান মো. সালেহ, পুলিশ কমিশনার, বরিশাল মেট্রোপলিটন
বিস্ফোরণের আকস্মিকতায় ঘটনাস্থলের পাশে থাকা বয়স্ক ব্যক্তি, তাঁর কাছাকাছি থাকা কয়েকজন নারী ও আরেক বয়স্ক ব্যক্তি দ্রুত সেখান থেকে সরে যান। ফুটেজে তাঁদের আতঙ্কিত হয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে দেখা যায়। সিসিটিভি ফুটেজে বিস্ফোরণের ঠিক আগে বা ওই মুহূর্তে কেউ বিস্ফোরক বস্তু নিক্ষেপ করেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবু রায়হান মো. সালেহ বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে বাইরে থেকে কেউ একটি বস্তু ছুড়ে মারার বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য, বিস্ফোরণের ধরন, উদ্ধার করা আলামত ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে এটি ককটেল সদৃশ বস্তু বলে মনে হচ্ছে।
পুলিশ কমিশনারের দাবি, বিস্ফোরণের পর তেমন কোনো শব্দও হয়নি। ফুটেজ পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও তদন্তের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত।
সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট আদালত চত্বরে গিয়ে বিস্ফোরণস্থল পরীক্ষা করে। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে।
ক্রাইম সিন ইনচার্জ খলিলুর রহমান জানান, তাঁরা ঘটনাস্থল থেকে কাচের গুঁড়া, প্লাস্টিকের টুকরা ও বারুদের উপকরণ সংগ্রহ করছেন। এসব আলামত পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে। সিআইডির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঘটনাস্থলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা ব্যাপক বিধ্বংসী কোনো আলামত পাওয়া যায়নি, তবে বিস্ফোরণের ধরন ও ব্যবহৃত উপাদান পরীক্ষার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মো. সালেহ বলেন, ‘পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্ফোরণের প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। আমাদের কাছে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, আতঙ্ক ছড়ানোর উদ্দেশ্যেই এটি হতে পারে।’
আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে জেলা জজ ও দায়রা জজ আদালতের বিচারকদের সঙ্গে আজ বিকেলে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে আদালতের নিরাপত্তা জোরদারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে আদালত চত্বরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে আদালতের প্রধান ফটক, আশপাশের সড়ক ও প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে সন্দেহজনক বস্তু বা ব্যক্তির বিষয়ে সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সুশান্ত সরকার বলেন, বিস্ফোরণের প্রকৃতি, এর উদ্দেশ্য এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা ফরেনসিক প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পর্যালোচনার পরই স্পষ্ট হবে।