
বড় কাপড়ের গাঁট মাথায় নিয়ে ঢাকা শহরে ফেরি করে বিক্রি করেন হ্যাংলা-পাতলা গড়নের ষাটোর্ধ্ব মজিবুর রহমান। অনায়াসে এমন পরিশ্রমের কাজ করলেও কাবু হন না তিনি। বোঝা নিয়ে নুয়ে পড়েন না। কিন্তু ফেনীতে ছেলের লাশের সামনে যেন ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছিলেন না। তাঁর মাটিতে পড়ে যাওয়া ঠেকাতে একজনকে ধরে রাখতে হচ্ছিল।
ফেনী জেনারেল হাসপাতালে ছেলে সোহাগ রহমানের (৩১) লাশ দেখে চিৎকার করে ওঠেন মজিবুর। বলেন, ‘ঈদের দিন দুপুরবেলা আমার লগে ভাত খাইসে। রাইতে সে বাসে কক্সবাজার যাইতেছিল জানতাম না। যখন জানলাম, তখন সে আর নাই। দুপুরে ছেলেটা এক লগে ভাত খাইল, রাইতে মইরা গেল পোলাডা।’
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বাসিন্দা মো. মজিবুর রহমান স্ত্রী–সন্তানদের নিয়ে থাকতেন পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায়। সোহাগ সেখানকার শাড়ি কাপড়ের দোকানে চাকরি করতেন। দোকানের দুই সহকর্মীর সঙ্গে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন বেড়াতে। বাবা জানতেন না এ তথ্য। তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের বলেছিলেন দোকানের পাওনা টাকা তুলতে কক্সবাজার যেতে হচ্ছে তাঁকে।
গতকাল রোববার ভোর চারটায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী সদর উপজেলার রামপুর এলাকায় যানবাহনের জটলায় কয়েকটি বেপরোয়া গতির বাস পরপর ধাক্কা দিলে সোহাগ নিহত হন। দুই সহকর্মীর সঙ্গে শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন তিনি। সোহাগ ছাড়াও এ ঘটনায় একজন বাসযাত্রী ও দোয়েল পরিবহনের একটি বাসের সুপারভাইজার নিহত হয়েছেন।
শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার বাসিন্দা মো. মজিবুর রহমান স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে থাকতেন পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায়। সোহাগ সেখানকার শাড়ি কাপড়ের দোকানে চাকরি করতেন। দোকানের দুই সহকর্মীর সঙ্গে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন বেড়াতে। বাবা জানতেন না এ তথ্য।
নিহত সোহাগের বাবা মজিবুর রহমান স্বজনদের নিয়ে আজ দুপুরে ফেনী এসে পৌঁছান। ছেলের লাশ গাড়িতে তোলার পর তাঁর বসার জন্য জায়গা করা হচ্ছিল। এ সময় আরও একবার কেঁদে ওঠেন তিনি। বলেন, ‘সে বাসে কইরা কক্সবাজার যাইতাসে, তা আমি জানতাম না।’ এরপর আর কিছু বলতে পারেননি তিনি।
নিহত সোহাগের ভগ্নিপতি মো. কামরুল বলেন, সোহাগ তাঁদের বলেছিলেন, দোকানের মালিকের বকেয়া টাকা তুলতে মালিক তাঁকে কক্সবাজার পাঠাচ্ছেন। তিনি বেড়াতে যাচ্ছেন, তা বলেননি। সোহাগ মারা গেলেও তাঁর ওপর দুই সহকর্মীর একজনের মাথা ফেটে গেছে, অপরজনের হাত ভেঙে গেছে। তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
সোহাগের মেজ বোন ফাহিমা আক্তার বারবার চোখ মুছছিলেন। তিনি বলেন, ‘সকালে ফেনী থেকে পুলিশ ফোন করে সোহাগের মৃত্যুর খবর দেয় আমাদের। খবর পেয়ে আমরা সপরিবার লাশ নিতে ফেনী এসেছি। মরদেহ পুরান ঢাকার লালবাগ নিয়ে যাওয়া হবে। রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে তাঁর দাফন হবে।’
নিহত অপর দুজন হলেন শ্যামলী বাসের যাত্রী মোহাম্মদ মোরশেদ (৩৯) ও দোয়েল বাসের সুপারভাইজার মোহামাদ কায়ছার (২৫)। নিহত মোহাম্মদ মোরশেদ ঢাকার বাংলামোটরের নিউ ইস্কাটন এলাকার মোকতাদুর রহমানের ছেলে। তিনি ওই এলাকার মোটর পার্টস ব্যবসায়ী। অপরজন মোহামাদ কায়ছার চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ থানার হাশিমপুর এলাকার আহম্মদ কবিরের ছেলে।
নিহত মোরশেদের বন্ধু মোহাম্মদ সুমন বলেন, ঢাকা থেকে তাঁর বন্ধু মোরশেদ তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ঈদের বন্ধে ঘুরতে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন। তাঁরা শ্যামলী বাসে করে কক্সবাজার যাওয়ার পথে ফেনীতে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। মোরশেদ ঘটনাস্থলেই মারা গেলেও তাঁর স্ত্রী ও সন্তান সুস্থ আছেন। ঈদের আনন্দ বিষাদে পরিণত হওয়ায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তাঁর স্ত্রী। দাফনের জন্য দুপুরে মরদেহ ফেনী থেকে ঢাকা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এ ঘটনায় আরও নয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁরা হলেন নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ এলাকার মোহাম্মদ দিপু (২৪), একই এলাকার নাজমুল (২৬), উজ্জ্বল (২৭), পাবনা জেলার মোহাম্মদ সবুজ (২৫), ইয়ামিন (২৬), টাঙ্গাইল জেলার পারভিন (৫৮), খালেদ মাহমুদ (৩৫), চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারীর তুর্য (৩৪) ও খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা এলাকার ভাগ্যমণি (২৫)।
ফেনীর সিভিল সার্জন ও ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রুবাইয়াত বিন করিম জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় ১২ জনকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে তিনজনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে গুরুতর তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া আহত একজন ফেনী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে অপর পাঁচজন বাড়ি চলে গেছেন।