বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার অপেক্ষা। পশ্চিম আকাশে সূর্যের লালচে আভা ছড়িয়ে পড়েছে মেঘনার বুকে। নদীর পাড়জুড়ে মানুষের ভিড়। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ পরিবার নিয়ে গল্পে মগ্ন, কেউ আবার ট্রলারে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন নদীতে।
লক্ষ্মীপুরের উপকূলীয় উপজেলা রামগতির চর আলেকজান্ডারের মেঘনা নদীর পাড়ের চিত্রটি এমনই। প্রথম দেখায় অনেকে ভাবতে পারেন, এটি কোনো সমুদ্রসৈকত। এ কারণে স্থানীয়দের কাছেও জায়গাটি পরিচিতি পেয়েছে ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মেঘনার পাড় এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র। ঈদ, সরকারি ছুটি কিংবা অন্য কোনো উৎসবে এখানে মানুষের ঢল নামে। লক্ষ্মীপুর ছাড়াও নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসেন।
গত শুক্রবার দেখা যায়, উপজেলা পরিষদ থেকে সামান্য হাঁটলেই মেঘনার পাড়। নদীভাঙন ঠেকাতে নির্মিত বাঁধের কারণে বিস্তৃত হয়েছে নদীর তীর। বাঁধের ওপর দাঁড়ালেই দেখা মেলে বিস্তৃত জলরাশি। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে বাঁধের কিনারে।
ঈদের ছুটিতে বন্ধুদের নিয়ে এলাম। অনেক দিন পর এমন খোলামেলা পরিবেশে এসে ভালো লাগছে। নদীর বাতাস আর সূর্যাস্ত মিলিয়ে জায়গাটা সত্যিই দারুণ।তুষার মাহমুদ, পর্যটক
নোয়াখালী থেকে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে আসা তুষার মাহমুদ বলেন, ‘ফেসবুকে এ জায়গার ভিডিও দেখেছিলাম। এরপর থেকেই এখানে আসার ইচ্ছে ছিল। ঈদের ছুটিতে বন্ধুদের নিয়ে এলাম। অনেক দিন পর এমন খোলামেলা পরিবেশে এসে ভালো লাগছে। নদীর বাতাস আর সূর্যাস্ত মিলিয়ে জায়গাটা সত্যিই দারুণ।’ চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থেকে আসা রাজু আহমেদ বলেন, ‘মেঘনার পাড়ে এসে মনে হচ্ছে যেন ছোট্ট একটা সমুদ্রসৈকতে আছি। বিশেষ করে বিকেলের দৃশ্যটা খুব সুন্দর।’
কেন আসেন পর্যটকেরা
আলেকজান্ডার মেঘনাপাড়ের মূল আকর্ষণ এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বিস্তীর্ণ নদী, দিগন্তজোড়া জলরাশি, নদীর ঢেউ, শীতল বাতাস ও মনোমুগ্ধকর সূর্যাস্ত দেখতে প্রতিদিন এখানে ভিড় করেন মানুষ। বিকেলে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্য ডোবার দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হন অনেকেই। পাশাপাশি ট্রলার বা স্পিডবোটে নদী ভ্রমণ, দূরে জেগে ওঠা চর দেখা, জেলেদের মাছ ধরা উপভোগ করার দৃশ্যও পর্যটকদের টানে।
প্রতিদিন কত মানুষ নদীর পাড়ে ঘুরতে আসেন, এর কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে উপজেলা প্রশাসনের হিসাবে সাধারণ দিনে কয়েক হাজার মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। ঈদ, সরকারি ছুটি ও বিভিন্ন উৎসবে সেই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বিশেষ দিনগুলোয় অন্তত ৫০ হাজার মানুষ এখানে আসেন বলে প্রশাসনের ধারণা।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ শাসনামলে ‘আলেকজান্ডার’ নামের একজন ইংরেজ রাজস্ব কর্মকর্তা (রেভিনিউ কালেক্টর) এ এলাকায় দায়িত্ব পালন করতেন। পরে তাঁর নাম অনুসারেই এ অঞ্চলের নামকরণ করা হয় ‘আলেকজান্ডার’। সময়ের পরিক্রমায় সেই নাম আজও রয়ে গেছে।
চর আলেকজান্ডারের এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে ঝুঁকিও। সরেজমিনে দেখা যায়, পর্যটক বহনকারী বেশির ভাগ ট্রলার ও স্পিডবোটে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসামগ্রী নেই। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়েও নৌভ্রমণ করানো হয়। নদীপাড়ে পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারও নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা শিক্ষক মুকুল চৌধুরী বলেন, নদীভাঙন ঠেকাতে নির্মিত বাঁধের কারণেই এখানে বেলাভূমির মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। জায়গাটি এখন মানুষের বিনোদনের কেন্দ্র। কিন্তু সংরক্ষণ ও পরিকল্পনা ছাড়া এটি টেকসই হবে না।
ষাটোর্ধ্ব মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বলেন, লক্ষ্মীপুরে বিনোদনের জায়গা খুব বেশি নেই। তাই মানুষ পরিবার নিয়ে এখানে আসে। পর্যটকদের জন্য বসার জায়গা, শৌচাগার ও নিরাপত্তা বাড়ানো প্রয়োজন।
রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, আলেকজান্ডারে পর্যটকদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। ট্রলার ও স্পিডবোটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পর্যটকদের সুবিধার্থে স্বাস্থ্যসম্মত গণশৌচাগার নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
যেভাবে যাবেন
লক্ষ্মীপুর জেলা শহর থেকে আলেকজান্ডার মেঘনাপাড়ের দূরত্ব প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার। লক্ষ্মীপুর-রামগতি আঞ্চলিক মহাসড়ক ধরে বাস বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যেতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা।
নোয়াখালীর মাইজদী থেকে আলেকজান্ডারের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। উন্নত সড়ক যোগাযোগের কারণে স্বল্প সময়েই সেখানে পৌঁছানো যায়। আলেকজান্ডার বাজার বা উপজেলা পরিষদ এলাকায় পৌঁছানোর পর কিছুক্ষণ হাঁটলেই বিস্তীর্ণ এ জায়গার দেখা মিলে।