ট্রেন
ট্রেন

স্টেশনে ট্রেন থামতেই বগিতে ঢুকে হামলা, ভুল করে কিশোরকে পিটুনি, পরে প্রকৌশলীকে মারধর

পাবনার চাটমোহর স্টেশনে ট্রেন থামার পর বেঘোরে মার খেল এক কিশোর। হামলাকারীরা পরে বুঝতে পারে যে তাদের ভুল হয়েছে। যাঁকে টার্গেট করেছিল, তিনি ওই কিশোরের সঙ্গে আসন বদল করেছেন। তারা আসন নম্বর ধরে হামলা করতে উঠেছিল। এরপর তাদের হামলার শিকার হন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রকৌশলী।

কোনো অভিযোগ না করে পরের স্টেশনে নেমে যায় আহত কিশোর। আর প্রকৌশলীও কোথাও অভিযোগ করতে যাননি। উল্টো যারা হামলা করেছে, তাদের পক্ষ থেকেই রেলওয়ে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

গতকাল সোমবার রাত আটটার দিকে পাবনার চাটমোহর স্টেশনে ঢাকা-রাজশাহী-ঢাকা রুটের সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ট্রেনের ভেতর এ ঘটনা ঘটেছে।

আহত প্রকৌশলীর নাম মামুনুর রশীদ। তিনি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রকৌশলী। ওই ট্রেনে ঢাকা থেকে রাজশাহী আসছিলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে মারধরের শিকার কিশোরের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। চাটমোহর স্টেশনে ওই ঘটনার পর ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশনে ওই কিশোর তার বোনকে নিয়ে নেমে যায়। প্রকৌশলীসহ তাঁরা সবাই ‘জ’ বগির যাত্রী ছিলেন।

ওই বগিতে থাকা একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ওই প্রকৌশলী রাজশাহী আসার জন্য কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠেছিলেন। আর দুই নারী ওঠেন বিমানবন্দর স্টেশন থেকে। তাঁরা ট্রেনে উঠে নিজেদের ব্যাগ রাখতে প্রকৌশলীর ট্রাভেল ব্যাগটি অন্য আরেক যাত্রীর ব্যাগের ওপর তুলে রাখেন। টাঙ্গাইলে এসে ওই যাত্রী এ নিয়ে প্রকৌশলীকে কথা শোনান। তখন প্রকৌশলী জানতে চান, তার ব্যাগ কে সরিয়েছেন। এ নিয়ে ওই দুই নারীর সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়। তখন ট্রেনে দায়িত্বে থাকা সিরাজগঞ্জ রেলওয়ে থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) শামীম আহমেদ এসে মীমাংসা করে দেন। তিনি দুই নারীর মুখোমুখি আসনে বসে থাকা প্রকৌশলীর আসনও বদলে দেন। এরপর ওই দুই নারী চাটমোহর স্টেশনে নামলেই একদল লোক ট্রেনে উঠে যায়। তারা গিয়ে প্রথমেই প্রকৌশলীর আসনে থাকা কিশোরকে মারধর করে। পরে ভুল বুঝতে বুঝতে পারে যে প্রকৌশলীর আসন বদলাবদলি হয়েছে। পরে তারা কিশোরকে ছেড়ে দিয়ে প্রকৌশলীকে মারধর করে।

প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রীরা জানান, ঘটনার সময় রেলওয়ে পুলিশের সহযোগিতা চাইলেও তারা আসেনি। ট্রেনটি ছাড়ার আগমুহূর্তে হামলাকারীরা নেমে যায়। এরপর পুলিশ আসে। পরের স্টেশনে মারধরের শিকার কিশোর নেমে যায়।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ওই দুই নারী ‘জ’ বগির ৬৪ ও ৬৫ নম্বর আসনে বসেছিলেন। শ্রীলেখা দাস নামের এক নারী টিকিট কেটেছিলেন। শ্রীলেখার মুঠোফোন নম্বরে কল করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। সুদীপ্ত সাহা দীপ নামের একজন ওই নারীর ভাই পরিচয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ট্রেনে তাঁর বোন এবং স্ত্রী চাটমোহরে আসছিলেন। ট্রেনের ভেতরে সহযাত্রী ওই ব্যক্তি তাঁর বোন ও স্ত্রীকে অপদস্থ করেছেন। বিষয়টি জানার পর তিনি রেলওয়ে পুলিশকে ফোন করেন। পুলিশ এসে সমাধান করে দেয়। কিন্তু বিষয়টি অনেকেই জানতে পারে। এ জন্য চাটমোহর স্টেশনে জনতা ওই লোকের গায়ে হাত দিয়েছে বলে পরে তিনি জানতে পেরেছেন।

সুদীপ্ত সাহা দাবি করেন, ততক্ষণে তাঁর বোন ও স্ত্রী ট্রেন থেকে নেমে চলে এসেছেন। বোন ও স্ত্রীকে অপদস্থ করার ব্যাপারে কোনো আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাকশি রেলওয়ে থানায় এ ব্যাপারে তাঁরা অভিযোগ করেছেন। হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগের কোনো কপি দেওয়া যাবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, থানায় যোগাযোগ করলেই পাবেন। তাঁর পক্ষ থেকে দেওয়ার কোনো প্রশ্ন ওঠে না।

ঘটনার পর থেকে ওই প্রকৌশলীর মুঠোফোন বন্ধ ছিল এ জন্য তাঁর সঙ্গে কথা বলা যায়নি। আজ মঙ্গলবার দুপুরের পর তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি দাবি করেছেন, ‘যারা হামলা করতে এসেছিল, তাদের দেখে সন্ত্রাসী মনে হয়েছে। এলাকায় হয়তো প্রভাব আছে, এ জন্য হামলা করেছে। ছোট ছেলেটা বেশি মার খেয়েছে। পরে আমাকেও মারধর করে। এখন আইনি ঝামেলায় পড়ার আশঙ্কায় তারা আমার নামে নেগেটিভ কথা বলছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি অন্য জেলায় থাকি, সরকারি চাকরি করি, যা হওয়ার হয়েছে। এখন আবার মামলা-মোকদ্দমা করে বিড়ম্বনায় পড়তে চাই না।’

ওই ট্রেনে দায়িত্বে থাকা এএসআই শামীম আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন বলেন, ‘প্রথমে কথা-কাটাকাটি হলে আমরা মিটমাট করে দিই। ব্যাগ রাখা নিয়ে গন্ডগোল। উত্ত্যক্ত করার ঘটনা নয়। মিটমাট করে দিলেও এলাকায় গিয়ে লোকজন নিয়ে এসে দুই নারী এমন হামলার ঘটনা ঘটিয়েছেন।’

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘হামলার শিকার ওই ব্যক্তি তো কোনো অভিযোগ করতে চান না। অভিযোগ করলে যারা হামলা করেছে, তাদের শনাক্ত করার সুযোগ রয়েছে।’