
সৌদিপ্রবাসী মেজ জামাতা ছুটিতে দেশে আসায় তিন মেয়ের পরিবারকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক মজিবুর রহমান ওরফে সুখচাঁন। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর বাড়ির অদূরে শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে যান তিন মেয়ের পরিবারের ছয় সদস্য। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন নদীতে ডুবে যান। শিশুসন্তানসহ মেজ মেয়েকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও একে একে লাশ হন মেজ জামাতা ও ছোট মেয়ে। নিখোঁজের ৪৫ ঘণ্টা পরও এখনো নাতির সন্ধান মেলেনি।
সুখচাঁনের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নে লাখপুর গ্রামে। বাড়ি থেকে শীতলক্ষ্যা নদী পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ। ওই নদীতে গোসলে নেমে ছোট মেয়ে, মেজ মেয়ের স্বামী ও বড় মেয়ের ছেলেকে হারিয়ে বিপর্যস্ত সুখচাঁন শোকে পাথর হয়ে গেছেন। কথা বলারও শক্তি নেই তাঁর। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকছেন।
‘এত কইরা কইলাম, নদীত যাওয়ার দরকার নাই, অন্য কোনোখান থাইক্যা ঘুইরা আসো। আমার কতা শুনল না, তারা নদীতই গেল। এখন তিন মাইয়ার ঘরে তিনজন নাই।...এত কষ্ট কেমন সহ্য করমু?মজিবুর রহমান ওরফে সুখচাঁন, মারা যাওয়া শান্তা আক্তারের বাবা
গতকাল শনিবার বিকেলে লাখপুর গ্রামে সুখচাঁনের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, দোচালা টিনের বাড়ির ভেতর থেকে আহাজারির শব্দ ভেসে আসছে। শত শত স্থানীয় লোক, প্রতিবেশী ও স্বজনেরা দুঃসময়ে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
মজিবুর রহমান ওরফে সুখচাঁন জানালেন, ছোট মেয়ে শান্তার বিয়ের সময় মেজ জামাতা ওবায়দুল্লাহ সৌদিতে ছিলেন। ছোট জামাতার সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর কখনো সামনাসামনি দেখা হয়নি। মেজ জামাতার ছুটিও শেষের দিকে। এ জন্য তিন মেয়ের পরিবারকে দাওয়াত করেছিলেন। গত শুক্রবার দুপুর ১২টার মধ্যে স্বামী-সন্তান নিয়ে মেজ মেয়ে শাহীনুর চলে আসেন। তারও আগে আসেন ছোট মেয়ে শান্তা ও বড় মেয়ের (আগেই অসুখে মারা গেছেন) একমাত্র ছেলে শান্ত। জুমার নামাজের পর সবাই একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেন। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ওবায়দুল্লাহ কলপাড়ে গোসল করতে গেলে স্বজনেরা নদীতে গোসল করতে যাওয়ার কথা বলেন। এরপরই তাঁরা দল বেঁধে নদীতে গোসল করতে যান।
শুক্রবার শীতলক্ষ্যায় গোসলে নেমে পাঁচজন তলিয়ে যাওয়ার পর শিশুসন্তানসহ এক নারীকে উদ্ধার করা হয়। তাঁদের উদ্ধার করতে গিয়ে নিখোঁজ হন আরও একজন। পরদিন তিনজনের লাশ উদ্ধার হলেও এখনো নিখোঁজ আছেন একজন। তাঁকে উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস।
সুখচাঁন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত কইরা কইলাম, নদীত যাওয়ার দরকার নাই, অন্য কোনোখান থাইক্যা ঘুইরা আসো। আমার কতা শুনল না, তারা নদীতই গেল। তিন মাইয়ার ঘরে তিনজন নাই। বড় মেয়েডা অসুখে মারা যাওয়ার পর জামাই আর বিয়ে করে নাই। হেগর ছেলে শান্তরে ছোটত্তে একাই মানুষ করছে। মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়া দেশের বাইরে যাওয়ার নিয়ত করছিল। ওই নাতিই আর নাই। গত বছর বিয়া দিলাম যে মাইয়ারে হেও নাই। কয়েক দিন পর সৌদি যাওয়ার কথা যে জামাইর, হেও আর নাই। এত কষ্ট কেমনে সহ্য করমু?’
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার শীতলক্ষ্যায় গোসলে নেমে পাঁচজন তলিয়ে যাওয়ার পর শিশুসন্তানসহ শাহীনুর আক্তারকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় অন্যদের উদ্ধার করতে গিয়ে সৌরভ মিয়া (১৮) নামের আরও একজন নিখোঁজ হন। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অভিযান চালিয়েও নিখোঁজ চারজনের সন্ধান মেলেনি। পরদিন শনিবার সকাল ১০টার দিকে ওবায়দুল্লাহ ও সৌরভের মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। দুপুরের দিকে ঘটনাস্থল থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে নিখোঁজ শান্তার (২৫) লাশ ভেসে ওঠে। এখনো নিখোঁজ শান্ত (২৪) নামের এক তরুণ।
মারা যাওয়া তিনজন হলেন গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ভঙ্গাল এলাকার সৌদিপ্রবাসী ওবায়দুল্লাহ (৩৮), গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামের ইসমাইল চৌধুরীর স্ত্রী শান্তা আক্তার (২৫) ও নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের লাখপুর গ্রামের মো. মজনু মিয়ার ছেলে সৌরভ মিয়া (১৮)। নিখোঁজ শান্তর বাড়ি টাঙ্গাইলে।
নিখোঁজ একজনকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের অভিযান চলছে উল্লেখ করে শিবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কোহিনুর মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, কোনো অভিযোগ না থাকায় পরিবারের সদস্যদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই উদ্ধার হওয়া তিনজনের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তাঁদের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
সুখচাঁনের প্রতিবেশী ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য মিন্টু মিয়া বলেন, দোচালা টিনের ঘরে স্ত্রী-ছেলেকে নিয়ে বসবাস করেন সুখচাঁন। ব্যাটারিচালিত একটি অটোরিকশা চালিয়ে আয়-উপার্জন করেন। তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়ে অনেকটা নির্ভার ছিলেন। কিন্তু শুক্রবারের ঘটনার পর সুখচাঁন একেবারেই ভেঙে পড়েছেন।