
কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আমির হামজার গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আজ শনিবার সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে শহরে থানাপাড়া জামে মসজিদের সামনে ছয়রাস্তার মোড়ে এ ঘটনা ঘটে।
এ হামলার জন্য গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের অভিযুক্ত করছেন কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের আমির খন্দকার এ কে এম আলী মহসীন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গণ অধিকার পরিষদের লোকজন আক্রমণ করেছে। তাঁদের সঙ্গে বিএনপির ছাত্রদল যোগ দিয়েছে। এমপি সাহেব (আমির হামজা) বাইরে থেকে আসছিলেন, ওরা ইটপাটকেল মেরে গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙেছে। আমাদের লোকজন প্রতিহত করতে গেলে মারামারি হয়েছে। আমরা এ ব্যাপারে কেস (মামলা) করব।’
হামলায় আমির হামজা আঘাত পেয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নে জেলা জামায়াতের আমির বলেন, ‘আঘাতপ্রাপ্ত হননি। এমপি সাহেব ওনার বাসায় আছেন। আমাদের লোকজন প্রটেকশন দিচ্ছে।’
সম্প্রতি আমির হামজা গণ অধিকার ও আমাদের নিয়ে কিছু আপত্তিকর কথা বলেছেন। এ জন্য গণ অধিকার ছয় রাস্তার মোড়ে সমাবেশ করছিল। জামায়াত যে অভিযোগ করছে তা একেবারেই ভিত্তিহীন। গণ অধিকারের বিষয়টা আমাদের ওপর চাপাচ্ছে।জাকির হোসেন সরকার, সদস্যসচিব, কুষ্টিয়া জেলা বিএনপি
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি গণ অধিকার পরিষদ সম্পর্কে আমির হামজা একটি বক্তব্য দিয়েছেন। সেই বক্তব্যের জেরে গণ অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে আজ বিকেলে কুষ্টিয়া শহরের ছয় রাস্তার মোড়ে থানাপাড়া জামে মসজিদের সামনে প্রতিবাদ সভা করা হয়। সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে আমির হামজা নিজ গাড়িতে করে মোড় হয়ে পাশেই তাঁর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। এ সময় সমাবেশ থেকে স্লোগান দিতে থাকেন গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা। তখন আমির হামজার গাড়ির সামনে-পেছনে পুলিশের একাধিক গাড়ি ছিল।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ছয় রাস্তার মোড় অতিক্রম করার সময় গণ অধিকার পরিষদ ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের (এমপির গাড়িবহরের সঙ্গে থাকা) মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। পাল্টাপাল্টি স্লোগানও চলতে থাকে। একপর্যায়ে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা আমির হামজাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে হেঁটে বাড়ির দিকে নিয়ে যান। গাড়িটিও তাঁদের পেছন পেছন যেতে থাকে। দুই দলের নেতা-কর্মীদের ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে দুই পক্ষই ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। ইটের আঘাতে আমির হামজার গাড়ির কাচ ভেঙে যায়। গাড়ির আরও কয়েক জায়গায় ইটের আঘাত লাগে।
দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের সময় ছয় রাস্তার মোড় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ছোটাছুটি করতে থাকে। উভয় পক্ষের মধ্যে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। ঘটনার সময় পুলিশ ও র্যাবের সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কবির হোসেন মাতুব্বর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সাথেই ছিলাম। এরই মধ্যে হঠাৎ করে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এমপি সাহেব বাড়িতে আছেন। পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে আছে।’
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আমির হামজার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর গাড়িটি গ্যারেজে রাখা। তিনি বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। নেতা-কর্মীদেরও ভিড় ছিল। ওই সময় ৫০-৬০ জন নেতা-কর্মীকে লাঠিসোঁটা বের হতে দেখা যায়।
আমির হামজার মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত তানভীর হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা একটা অনুষ্ঠান শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম। এমপি সাহেবের গাড়ির সামনে ও পেছনে পুলিশ ও র্যাবের গাড়ি ছিল। এমপি সাহেব চলে যাওয়ার সময় গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা আক্রমণ করে। ইট দিয়ে গাড়িতে আঘাত করে। সদর থানার ওসির উপস্থিতি থাকা সত্বেও হত্যার উদ্দেশে এ আক্রমণ হয়। ইটের আঘাতে আমার পায়ে রক্ত ঝড়েছে।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গণ অধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলার সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। তবে বিষয়টি নিয়ে গণ অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন তাঁর ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, কুষ্টিয়ার এমপি আমির হামজা তাঁর এক বক্তব্যে গণ অধিকার পরিষদকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন, সেই বক্তব্যের প্রতিবাদে কুষ্টিয়ায় গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা মানববন্ধন করেন। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল করলে সেখানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে গণ অধিকার পরিষদের ৪০-৫০ জন নেতা-কর্মী গুরুতর আহত হন।
হাসান আল মামুন ফেসবুকে আরও লিখেছেন, ‘প্রিয় জামাত, আপনারা ভুলে গেছেন গণ অধিকার পরিষদের অবদান? সমস্যা নেই, সময় বলে দিবে আপনারা কোন পথে যাবেন! শেখ হাসিনার পথ আপনাদের ডাকছে।’
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমির হামজার সর্মথকেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে শহরের হাইস্কুল মার্কেটে গণ অধিকার পরিষদের জেলা কার্যালয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। পরে তাঁরা মিছিল নিয়ে শহরের ছয় রাস্তা মোড়ের পাশে হরিপুর সংযোগ সেতুর নিচে যায়। সেতুর নিচে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায়। এতে শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় সাংবাদিকেরা পেশাগত দায়িত্ব পালনে গেলে তাঁদের ওপর চড়াও হয় ভাঙচুরকারীরা।
এ বিষয়ে গণ অধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক তৌকির আহমেদ বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষে ফিরে যাওয়ার সময় আমির হামজার সমর্থকেরা তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এতে কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজন এসেছিলেন। তাঁরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। তাঁদের সামান্য কাটাছেঁড়া দেখা গেছে। ইটের আঘাত হতে পারে।
গণ অধিকারের বিষয়টা আমাদের ওপর চাপাচ্ছে
আমির হামজার ওপর হামলার বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরকারের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তিনি বলেন, ‘ছাত্রদলের ছেলেরা গিয়ে দুই পক্ষকেই সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছে। আমরা কখনোই চাইনি মারামারি হোক।’ তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি আমির হামজা গণ অধিকার ও আমাদের নিয়ে কিছু আপত্তিকর কথা বলেছেন। এ জন্য গণ অধিকার ছয় রাস্তার মোড়ে সমাবেশ করছিল। জামায়াত যে অভিযোগ করছে তা একেবারেই ভিত্তিহীন। গণ অধিকারের বিষয়টা আমাদের ওপর চাপাচ্ছে।’