পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানার চাওয়াই নদীর সেতু বোমা দিয়ে ভেঙে দেন মুক্তিযোদ্ধারা। এ কারণে তেঁতুলিয়ায় আর যেতে পারেনি পাকিস্তানি বাহিনী।
মহান মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা ছিল মুক্তাঞ্চল। এই মুক্তাঞ্চলে গিয়ে কাজ করেছেন অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীসহ প্রবাসী সরকারের অন্য মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা। যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ আর কর্মকর্তাদের অবস্থানের জন্য নিরাপদ স্থান ছিল তেঁতুলিয়ার ঐতিহাসিক ডাকবাংলো।
ব্রিটিশ আমলের এই ডাকবাংলো বর্তমানে জেলা পরিষদ ডাকবাংলো হিসেবে পরিচিত। মহানন্দা নদীঘেঁষে উঁচু একটি টিলার ওপর অবস্থিত ১০০ বছরের পুরোনো ডাকবাংলোটি এই অঞ্চলের কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, বাংলোটি মূলত কত সালে নির্মাণ করা হয়েছে এর সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ডাকবাংলোটির নির্মাণশৈলী অনেকটা ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের।
এ থেকে ধারণা করা যায়, ব্রিটিশ শাসকেরা এই অঞ্চলের শাসনকাজ পরিচালনার জন্য এবং বিশ্রামাগার হিসেবে এই বাংলো ব্যবহার করতেন। বাংলোটি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের নীরব সাক্ষী। প্রথম দিকে এখানে বসে সভা করতেন মন্ত্রী-কর্মকর্তারা। পরে ডাকবাংলোতে মুক্তিযুদ্ধের ৬ নম্বর সেক্টর কমান্ডার এম কে বাশার বসবাস করতেন। এখানে বসেই ৬ নম্বর সেক্টরের যাবতীয় পরিকল্পনা করতেন মুক্তিযোদ্ধারা।
বিভিন্ন লেখকের বই ঘেঁটে আর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশের যে চারটি থানা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ‘মুক্তাঞ্চল’ ছিল, তার মধ্যে তেঁতুলিয়া অন্যতম। ১৭ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনী পঞ্চগড় সদর দখল করে নেয়। ওই দিন যুদ্ধে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছিয়ে যান। মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নেন সদর উপজেলার উত্তরের শেষ প্রান্ত মাগুরমারীতে। তাঁরা অমরখানার চাওয়াই নদীর সেতু বোমা দিয়ে ভেঙে দেন। এ কারণে সদরের অমরখানায় ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রার সর্বশেষ সেনা ক্যাম্প। এর উত্তরে তারা আর যেতে পারেনি। পরে ২৯ নভেম্বর সকালে মুক্ত হয় পঞ্চগড় জেলা শহর।
স্থানীয় ইতিহাসবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ৯ জুন মুজিবনগর সরকারের ত্রাণ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান উত্তরাঞ্চল পরিদর্শনের সময় তেঁতুলিয়ায় আসেন। জুলাই মাসের ৪ তারিখে যুদ্ধাবস্থা দেখতে তেঁতুলিয়ায় আসেন জেনারেল ওসমানী। এ ছাড়া অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলীসহ সরকারের অন্য মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা তেঁতুলিয়ায় এসে ৬ নম্বর সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা সিরাজুল ইসলাম ও কামরুদ্দীন আহমদসহ মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া তেঁতুলিয়ায় এসেছিলেন দেশি-বিদেশি অনেক সাংবাদিক। এই মুক্তাঞ্চল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বাছাই, প্রশিক্ষণে পাঠানো, তাঁদের খাদ্য, বস্ত্র ও অস্ত্রের জোগানসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে।
তেঁতুলিয়া উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেহের আলী বলেন, যুদ্ধ শুরুর পরপরই তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোতে ৪১ জন মানুষের উপস্থিতিতে একটি সভা হয়েছিল। সেখানে জেনারেল ওসমানী, তাজউদ্দীন আহমদ, তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাকসহ তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনিও সৌভাগ্যক্রমে উপস্থিত থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরে তাঁদের একত্র করে মুজিব ক্যাম্পে পাঠানো হয়।
পঞ্চগড়-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল হক প্রধান বলেন, যুদ্ধ চলাকালে অক্টোবর মাসের শুরুর দিকে অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ভজনপুর থেকে হেঁটে তেঁতুলিয়ায় এসেছিলেন। সন্ধ্যার দিকে তিনি আওয়ামী লীগের সভায় যোগ দেন। মিটিং শেষে ৬ নম্বর সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা সিরাজুল ইসলাম খেয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন তাজউদ্দীন আহমদকে। এ সময় তিনি জানতে চান, কী খাবার আছে। সিরাজুল ইসলাম পোলাও ও খাসির মাংসের কথা বলা মাত্রই তাজউদ্দীন আহমদ রেগে যান। এ সময় তিনি বলেন, ‘যুদ্ধশিবিরের লোক এক বেলা ভালো খাবার পাচ্ছে না, আর আমি পোলাও খাসি খাব! ভাবলেন কীভাবে?’ এরপর তিনি না খেয়েই সেখান থেকে চলে যান।