তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে খুলেছে সুন্দরবনে প্রবেশের দ্বার। মঙ্গলবার সকালে বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশন ঘাটে
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে খুলেছে সুন্দরবনে প্রবেশের দ্বার। মঙ্গলবার সকালে  বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশন ঘাটে

তিন মাস পর খুলেছে সুন্দরবনের দ্বার, জেলেদের সাড়া কম, আসছেন পর্যটকেরা

প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে খুলে দেওয়া হলো সুন্দরবনের দ্বার। কিন্তু আজ মঙ্গলবার প্রথম দিনেই বনে ঢোকার তেমন আগ্রহ দেখালেন না জেলেরা। টানা বৃষ্টি, নদীতে মরা কাটাল আর দস্যুদের ভয়—সব মিলিয়ে সুন্দরবনের পথে পা বাড়াতে দ্বিধায় তাঁরা। তবে পর্যটকদের আনাগোনায় প্রাণ ফিরতে শুরু করেছে সুন্দরবনের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে।

বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের সামনে নৌকা রেখে অনুমতিপত্র নিতে এসেছিলেন জেলে জহর আলী মালী। তিনি বলেন, ‘আজ প্রথম দিনে পাস নিতে এসেছি। সুন্দরবনে এখন ডাকাতের ভয় আছে। তাই বনের ভেতরে যাব না। এই ফরেস্ট স্টেশনের পাশের খোলপেটুয়া নদীতে মাছ ধরব। সুন্দরবন দস্যুমুক্ত না হলে বনের বেশি গভীরে যাব না।’

বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা ইরফান উদ্দীন জানান, তাঁদের স্টেশনে ৯৫৪টি নৌযানের বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) রয়েছে। আজ বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত জহর আলী মালী ছাড়া আর কোনো জেলে অনুমতিপত্র নিতে আসেননি। সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যে নদীতে মরা জোয়ার থাকায় মাছও কম পাওয়া যাচ্ছে। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলের সংখ্যা বাড়তে পারে।

সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের কৈখালী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা শ্যামা প্রসাদ রায় বলেন, কৈখালী ও পাশের কদমতলা ফরেস্ট স্টেশন মিলিয়ে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ৩৭ জন জেলে সুন্দরবনে অবস্থানের অনুমতি নিয়েছেন। অথচ এ দুটি স্টেশনের আওতায় মোট ১ হাজার ২৬টি নৌযানের বিএলসি রয়েছে।

বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনসংলগ্ন নদীতে নৌকার পাটাতন মেরামত করছিলেন জেলে খায়রুল সানা। সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরেই তাঁর সংসার চলে। তিন মাস বনে ঢুকতে না পারায় খুব কষ্টে দিন কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এখন মাছ ধরতে না পারলে সংসার চলবে না। দুপুরের জোয়ারে বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, একটু পরে পাস নেব।’

আমি নৌকা নিয়ে বনে মাছ ধরতে যাই না, পর্যটক নিয়ে ঘুরি। মালঞ্চ নদী ধরে বনের ভেতরে মায়ের খাল পর্যন্ত নিয়ে যাই। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা ঘোরাই। এক ঘণ্টার জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা নিই। আজই প্রথম ট্রিপ নিয়ে যাচ্ছি।
সাগর হোসেন, মাঝি

জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময়ও কেউ কেউ বন বিভাগের নজর এড়িয়ে সুন্দরবনে ঢুকে বিষ দিয়ে মাছ ধরেছেন। এতে মাছ ও কাঁকড়ার সংখ্যা কমে গেছে বলে তাঁদের আশঙ্কা। একই সঙ্গে দস্যুদের চাঁদার ভয়ও তাঁদের বনে যাওয়ার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।

নৌকায় মালামাল তুলছিলেন জেলে আব্দুর বারী। তিনি জানান, একটি নৌকায় সাধারণত দুই থেকে তিনজন জেলে থাকেন। ছয় দিন বনে থেকে মাছ ও কাঁকড়া ধরে ফিরে আসেন তাঁরা। এভাবে বছরের প্রায় ৯ মাস সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা চলে তাঁদের। আব্দুর বারী বলেন, ‘এবার বন্ধের সময় অনেকে বিষ মারি সব শেষ করিছে। তাই এবার আয় কেমন হবে, বলা যাতিছ না।’

তবে তিন মাস পর সুন্দরবন খুলে দেওয়ায় পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। সুন্দরবন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (টিওএএস) সূত্রে জানা গেছে, সংগঠনটির অধীনে বর্তমানে ৭৫টি নৌযান রয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মো. মঈনুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার বলেন, আজ প্রথম দিন খুলনা থেকে সাতটি লঞ্চ ২২০ জন পর্যটক নিয়ে সুন্দরবনের উদ্দেশে যাত্রা করেছে।

টানা বৃষ্টি, নদীতে মরা কাটাল আর দস্যুদের ভয়—সব মিলিয়ে সুন্দরবনের পথে পা বাড়াতে দ্বিধায় জেলেরা

শ্যামনগরের সুন্দরবনঘেঁষা মালঞ্চ নদীর পাড় থেকে দুই পর্যটক নিয়ে বনের উদ্দেশে রওনা হচ্ছিলেন মুন্সিগঞ্জ এলাকার নৌকার মাঝি সাগর হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি নৌকা নিয়ে বনে মাছ ধরতে যাই না, পর্যটক নিয়ে ঘুরি। মালঞ্চ নদী ধরে বনের ভেতরে মায়ের খাল পর্যন্ত নিয়ে যাই। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা ঘোরাই। এক ঘণ্টার জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা নিই। আজই প্রথম ট্রিপ নিয়ে যাচ্ছি।’

সাতক্ষীরা হয়ে সুন্দরবনে যেতে পর্যটকদের কাছে কলাগাছিয়া ও দুবেকী অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে হারবাড়িয়া, শেখেরটেক ও দুবেকীতে যেতে বন বিভাগের বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন। এক দিনের ভ্রমণে সুন্দরবনের কাছাকাছি যেতে চাইলে মোংলার করমজল ও হারবাড়িয়াও পর্যটকদের পছন্দের জায়গা।

সুন্দরবনের প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য হিসেবে সংরক্ষিত। এসব এলাকায় সাধারণভাবে মাছ ধরা বা প্রবেশের সুযোগ নেই। ফলে বনে প্রবেশের অনুমতি মিললেও অভয়ারণ্য এলাকায় ইচ্ছেমতো ঘোরাফেরা করা যাবে না। পর্যটকদের নির্ধারিত পর্যটনকেন্দ্র ও অনুমোদিত পথেই চলতে হবে। বন বিভাগ জানিয়েছে, সুন্দরবনের পশ্চিম ও পূর্ব বিভাগের চারটি রেঞ্জে এবার ১২ হাজার নৌযানকে বিএলসি দেওয়া হচ্ছে।

সুন্দরবন। সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকায়

সুন্দরবন ভ্রমণের সময় পরিবেশের ক্ষতি হয়—এমন সামগ্রী বা কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে পর্যটকদের নির্দেশনা দিয়েছে বন বিভাগ। প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেটসহ কোনো ধরনের বর্জ্য বনে না ফেলে নির্দিষ্ট ওয়েস্ট বিনে ফেলার অনুরোধ করা হয়েছে।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় পন্টুনগুলো মেরামত করা হয়েছে এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। পর্যটক ও মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সুন্দরবনের ক্যাম্প ও স্টেশনগুলোকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটক, জেলে ও বননির্ভর মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। পরিবেশ ও বন্য প্রাণীর ক্ষতি হয়—এমন কোনো কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না।