
‘শুন্যাছি রাজার ভোট। এখুনো ভোট লিয়া কেহু আসেনি হামাদের কাছে। ভোট লিয়া হামাদের কথার কি দাম আছে? কী আর চাহাবো, কী আর পাব? এখুন তাক কিছু পাইনি। স্বাধীনের পর থাকি বহুত ভোট দেখনু। হামমো খাটিয়েই খাই। খাটিয়েই খাইতে হোইবে। ভোট দিয়া হামরা কিছুই পাব না।’
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্রভূমির ঝিলিম ইউনিয়নের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী কোল সম্প্রদায়ের গ্রাম বিলবৈলঠার এক নারী। তাঁদের কাছে সংসদ নির্বাচন মানে রাজার ভোট। সদর উপজেলার বাবুডাইং বনের পাশে খাসজমিতে তাঁরা বসবাস করেন। আশপাশে পাঁচটি গ্রামে তাঁরা বহু বছর ধরে বসবাস করেন।
স্থানীয় ফিলটিপাড়ার কল্পনা মুর্মু, চাতরাপাড়ার লাছাম টুডু, চটিগ্রামের লক্ষ্মণ মুর্মু, জাটকাপাড়ার রাজিব হাঁসদা, রাবিন হাঁসদাসহ কয়েকজনের সঙ্গে ভোট নিয়ে কথা হয়। তাঁরা বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট চাওয়ার জন্য কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এখনো তাঁদের গ্রামে যাননি।
ফিলটিপাড়ার গৃহবধূ উচ্চমাধ্যমিক পাস কল্পনা মুর্মু বলেন, ‘হামরা কী সমস্যা নিয়ে বসবাস করি, তা কেউ জানতে আসে না। মাদক আর বাল্যবিবাহের সমস্যায় আমরা জর্জরিত। সামনে আগাইতে পারি না। কেউ আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। হামাদের মনে করে, হামরা আওয়ামী লীগের ভোটার। এখুন তো আওয়ামী লীগ নাই। ওদের আমলেও তো হামরা ভালো ছিনু না। আর কখুন ভালো থাকব, তা-ও জানি না।’
উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের বাসিন্দা হিংগু মুর্মু বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের নাচোল ও গোমস্তাপুর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। তাঁদের গ্রামগুলোয় সশরীর এখনো কোনো দল ভোট চাইতে যায়নি। ভোটের উত্তাপ এখনো সৃষ্টি হয়নি।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি ও গোমস্তাপুর উপজেলার বাসিন্দা বিচিত্রা তিরকি বলেন, প্রতিবারই ভোটের আগে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু পূরণ করা হয় না। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী–অধ্যুষিত গ্রামগুলোর কাছে এসে থেমে যায় উন্নয়ন। তাঁর গ্রামের (জিনারপুর) পাশ দিয়ে পাকা রাস্তা গেলেও গ্রামে ঢোকেনি। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী–অধ্যুষিত গ্রামগুলোয় এখনো কাঁচা রাস্তা। বিদ্যুৎও পরে ঢোকে। গ্রামের খাসপুকুর ভোগদখল করতে পারেন না বাসিন্দা। অন্যায়, নিপীড়ন, ভূমিদস্যুদের অপতৎপরতা থেকে তাঁরা মুক্ত হননি। তাঁরা নিজেরা আলোচনা করে দাবিদাওয়া ঠিক করেছেন। বিএনপি-জামায়াতের দুজনের প্রার্থীকেই তাঁরা তাঁদের মনোভাব জানতে চান।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আদিবাসী গ্রামগুলোয় একেবারে যে যাইনি, তা ঠিক নয়। কিছু গ্রামে গেছি। তাঁদের গ্রামগুলোয় যে খাসপুকুরগুলো আছে, আওয়ামী লীগের আমলে তাঁরা দীর্ঘদিন ভোগদখল করতে পারেননি। পুকুরগুলো তাঁদের হাতে না থাকাটা এখন তাঁদের প্রধান সমস্যা। আমি নির্বাচিত হলে এ সমস্যার সমাধান করব বলে তাঁদের জানিয়েছি।’
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মু. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আদিবাসী নেত্রী বিচিত্রা তিরকির সঙ্গে কথা হয়নি। তবে নাচোল ও গোমস্তাপুরের কিছু গ্রামে গেছি। তাঁদের ধর্মীয় উৎসবগুলো যেন তাঁরা নির্বিঘ্নে পালন করতে পারেন এবং মুসলমানরা যে অধিকার ভোগ করেন, তাঁরাও যেন সেই অধিকার পান, সেই চেষ্টা করব।’